Dec 30, 2022

গোপেশ চক্রবর্তী

সঙ্গী 

বোধের ভেতর মায়া-স্টেশন 
তুমিও হও প্রকট-

একদম একা না-হলে...

নিবারণ নাথ

প্রেম

প্রতি রাতই যে বৃষ্টি ধূঁয়ে দেয় শরীর
এক উন্মাদনা আমাকে
বিব্রত করে
রক্তচাপ বাড়ে।

ভোরের কুয়াশায়
আহ্লাদে নাচে হাত পা
বাড়ির রাস্তায় দেখি সেই বৃষ্টি। 

অন্তমিলে 
আমি এক নষ্ট পুরুষ।

তৈমুর খান

বকশিক (অনুগল্প)

 হন্তদন্ত হয়ে রোজকার মতো আজও ট্রেনে উঠেছি। সকাল সাড়ে আটটায় ট্রেন। এক মিনিট দেরি হলেই মিস হয়ে যাবে। আজও ভিড়ে ঠাসা ট্রেন সিট ফাঁকা নেই বললেই চলে। সিটের এক ধারে একটি ব্যাগ রাখা আছে। কার ব্যাগ? কার ব্যাগ? বারকয়েক চিৎকার করে কারও সাড়া না পেয়ে ব্যাগটাকে কোলের ওপর নিয়েই বসে পড়ি। ট্রেন চলতে শুরু করে। প্যাসেঞ্জার ওঠানামা করতে-করতেই তিন-চার স্টেশন পেরিয়ে যায়। কিন্তু ব্যাগের মালিক কই? এখনো কেউ খোঁজ করল না! আর দুই স্টেশন পেরিয়েই আমাকে নামতে হবে। সেখান থেকে টোটো ধরে পনেরো মিনিট এগিয়ে গেলে তারপর আমার অফিস।

    আমি একটা বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। সর্বসাকুল্যে বাইশ হাজার টাকা বেতন পাই। এখনও ঘর করে উঠতে পারিনি। দীর্ঘদিন থেকেই ছেলে বাইক কেনার বায়না করলেও ওকে থামিয়ে রেখেছি। আর কয়েক মাস যাক তারপর কিনে দেবো। এমনি করেই তিন বছর পেরিয়ে গেছে। একমাত্র মেয়ের জন্য বিয়ের ঋণ নেওয়া ব্যাংকের টাকা এখনও পরিশোধ করা যায়নি। বছরে একবার ভেলোর যেতে হয় স্বাস্থ্য চেকআপের জন্য। তার জন্য আগে থেকেই ছুটি জমিয়ে রাখতে হয়। প্রতি মাসের ঘর ভাড়া দিয়ে, ওষুধের জন্য আলাদা করে কিছু খরচ রেখে এবং প্রতিমাসে ছেলের জন্য কোচিং সেন্টারের ফি বাবদ খরচ যোগ করে বাদবাকি যা থাকে তাতে কোনওরকম বেঁচে থাকা যায়। এরপর শখ-তামাশা-আহ্লাদ বলে আর কিছু থাকে না।            গিন্নি মাঝেমাঝেই খোঁচা মেরে বলে: 

    তোমার আর অভাব ঘুচবে না! কখনও একটা দামি শাড়ি দিতে পারলে না। হাতখরচের জন্য মাসে এক হাজার টাকাও দিতে পারোনি। নিজেদের একটা ঘরও হল না আজ পর্যন্ত!

     এসব কথার উত্তর দিতে গিয়ে আমার কন্ঠস্বরে কম্পন অনুভব করেছি। গলা নামিয়েই বলতে হয়েছে:

 দেখে নিও একদিন সবই হবে। ছেলেটাকে বড় হতে দাও আর ব্যাংকের ঋণ শোধ করে ফেলি। তারপর থেকেই আমাদের আর কোনও খরচ থাকবে না। তখন তোমাকে হাতখরচও দিতে পারব।

 কতকী ভাবতে-ভাবতেই ট্রেন আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেছে। সিট থেকে উঠতেই সামনে দাঁড়ানো একজন প্রায় জোর করেই বসে পড়লেন। হাতের ব্যাগখানা ওর হাতে দিয়ে বললাম: 

    কার ব্যাগ জানি না, এই সিটেই রাখা ছিল, চাইলেই দিয়ে দেবেন। বলেই দ্রুত ব্যাগখানা তাকে দিয়ে নেমে পড়লাম।

 ততক্ষণে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে:

   একটি বিশেষ ঘোষণা, এই ট্রেনের তিন নং কম্পার্টমেন্টে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার একটি ব্যাগ রাখা ছিল। ব্যাগটি যিনি নিজের কাছে রেখেছেন দয়া করে স্টেশন মাস্টারের কাছে জমা দিয়ে যান।কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়া ব্যাগ। কর্তৃপক্ষ তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা বকশিশ দেবেন।

   ঘোষণাটি শুনতে-শুনতেই আমার একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। ওই ব্যাগটি কালো রঙের লাল বর্ডার দেওয়াই ছিল! 

    বার কয়েক নেমে আসা কম্পার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।ততক্ষণে পুলিশ এসে ঘিরে ফেলেছে চারিপাশ।

সন্দীপ সাহু

শেষের কবিতা

ঘনতম অতল নীল, প্রেমিকার মতো
চোখ চেয়ে ইশারা করে। ইশারায়
তারায় তারায় নৌকা ভেসে আসে!
নৌকাটা নীল গোলাপে একেবারে ভর্তি!

ভেসে এসে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে
বাসর শয্যায় নোঙ্গর ফেলে! প্রেমিকার মতো হেসে!
কখনো কেউ ভালোবাসেনি! যোগ্যতাও ছিল না!
সমস্ত ব্যর্থতাগুলো একে একে জরো হয়!

বিরোধী দলের মতো চিৎকার করে 
অনাস্থা এনে সমস্ত শাদাকে কালোতে মোছে!
বৈধ সম্পর্কগুলো চাবিকাঠি খুঁজতে
দেহে ময়নাতদন্ত চালায় দক্ষ ব্যোমকেশের মতো!

সাতপাকে ঘুরলেই সাত জন্ম, পাঁকে ডোবে!
পাঁকে পাঁকে সম্পর্কগুলো চাবিকাঠির ওপর
অধিকার নিয়ে পচা গন্ধ ছোটায়! ওই গন্ধে
মানুষ মরে। মানুষ মরলে সম্পর্ক থাকে কি!

ঘন অতল নীল আবার চোখ তুলে চায়!
চাবিকাঠি বৈধ সম্পর্কের মৃত মানুষগুলো কাছে রেখে,
ওই চোখের ইশারা-পথে এগিয়ে যাই।সেই চোখ 
সেই হাসি নায়িকার মতো ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে!

শিল্পীর কাছে একান্ত অনুরোধ, ওর একটা
ছবি এঁকো! মুখটা কোরো ঠিক আমার মতো!
মুখে যেন কাপুরুষের জামা পরিও না!
লড়াই করে পরাজয়ের যে রঙ হয়, তা-ই এঁকো!

জানি তুমি অম্লান বদনে আঁকতে পারবে!
তুমি এমন একটা নদী, জোয়ার ভাটা সমানে খেলে!

নিয়তি রায় বর্মন

মায়ের অশ্রু

আমার মায়ের অনেক কষ্ট
পিতৃহীন সংসারে মায়ের উৎকন্ঠার শেষ নেই--
কোটি কোটি ভাই বোনের গ্রাসাচ্ছাদন, হায়! 
কাগজে স্বাধীনতা এলেও সন্তানের জীবনে বসন্ত আসে নি। 
মায়ের সন্তানরা অনেক কেজো, দুই হাত দুই পায়ে অনেক বল--
সোনার ফসল ফলায়, গগন চুম্বী অট্টালিকা সাজায়--
জগৎজোড়া নাম তাদের। 
চারু শিল্পে, কারু শিল্পে, সাহিত্য সংস্কৃতিতেও 
বিশ্ব জয় করেছে অনেক সম্মানে ও পদকে। 
মায়ের রবি, সত্যজিৎ, জগদীশ, অমর্ত্য, 
অভিজিৎ প্রত্যেকে মায়ের অলঙ্কার। 
বীর নেতাজী, সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, 
সোমেন চন্দ, প্রীতিলতা, কল্পনা, কল্পনা চাওলা স্বনামেই জ্যোতিষ্ক। 
দেশের অন্নদাতা নিরন্ন, শ্রমিকরা কাজ হারায়--
কোভিড ঊনিশ জালে সবাই দিশেহারা। 
মায়ের সাম্রাজ্যের ভার যারা নিয়েছেন--তারা দিক ভ্রান্ত--
মায়ের চোখের অশ্রু আর শুকোয় না। 

খোকন সাহা

বাঁধ ও বাধা

' কি করে কাছে টানি
দুই পাঁজরের ঝাপটানি '।
ঘুরে ফিরে অসংখ্যবার
এইখানে  থামি ;
যেখানে আবিস্কারের চেয়ে
অনাবিস্কারের রক্তগুলি 
জ্বল জ্বল বাণী ।

হয়তো ঝোঁপঝাড়ের মুখে
অথবা প্রণতি সিন্ধু তীরের চোখে
চাপা হাসি চরিয়ে যায়
মিতালি বঁধুয়ার জলমাটিতে ----- ;
কত রকমের ফুল ফোটা,
কত খোলা চোখের জ্বলন্ত শাসানি ----
পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা খুলে যায় ;
আর তার রঙ রেখায় ফুটে ওঠে
ভূমিকাসুন্দর পৃথিবীর জানালা ।

তবুও সময়ের বাকমেরু
অন্ধকার থেকে ছুটে চলে ---
রোদ্দুরের দিকে।
আমাদের রক্তের নদীতীর হাটবাট পালাগান জুড়ে,
তখন তোমার অধৈর্য মুখ থেকেও
ফুটে ওঠে -----ফুল আর স্বপ্ন পংক্তিমালা  । 
ভেঙ্গে যায় সব বাঁধ ও বাধা ।

নমিতা সরকার

আবেগের রঙ নেই 

নিজেকেই ভুলে গেছি প্রকৃত সুখ  পাখির পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে, না না এভাবে আর নিজেকে দূরে সরানো ঠিক হবে না...

অনেক তো হলো নিজেকে ভুলে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো ভ্রমরের গান শোনা, 

চোখের ঘুম সরতে না সরতে যে সুকণ্ঠ পাখির স্বর শুনতে ইচ্ছে জাগে অধির আগ্রহে... 

সে পাখি, আমার কাছে আসতে ভুলে গেছে, ভুলে গেছে আমার ভুবন গায়ে ঘুরে ঘুরে গান শোনাতে অথচ তাকে শুনতে আমি নিজেকে ভুলে গেছি-

অনেক তো হলো নিজের আত্মাকে অনুভূতির ব্যস্ত শহরে আবেগের অদ্ভূদ রঙে রাঙিয়ে দেওয়া... 

আবেগে নাকি প্রেম নেই... 

তাহলে নিশ্চয়ই চিতার দহন জ্বালা আছে, তারজন্যই হয়তো নিজস্বতাকে ভুলে আবেগের আগুনে আহুতি দিতে হয়...

আর পাখি আমার আপন মনে আপন প্রেমে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ায় সুখের নেশায়... 

থাকসে পাখির ইচ্ছে ডানায় আপন বাসায়, আমি নাহয় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি অগ্নি চিতায়।

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

অকিঞ্চিৎকরগুচ্ছ
১
ডুব দাও, ডুব দাও
পিছলে যাচ্ছে সময়।
হে হিরণ্যগর্ভ! আমার জন্যে অবশিষ্ট রয়েছে কি আর কোন সূর্য উদয়?
২
একখানি স্বপ্ন ক্রমশ সর্পিল গতিতে 
অন্তর্হিত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে,
রেশ তার রয়ে যাচ্ছে, 
অথচ বিষয়বস্তুর গভীরে আদি আর অকৃত্রিম পরমশূন্য।
তাহলে স্বপ্নটি কার? 
৩
দিনান্তে বা নিশান্তে জাগে আমার অহং, জাগে আমার প্রাণ। বিস্ময়ে ক্লান্ত আমি, তবুও দিগন্তে অশ্বমেধের ঘোড়া, তবুও যুদ্ধের প্রান্তরে উন্মুক্ত সাম্রাজ্যের তলোয়ার। হে ঋতবান, আর কত রক্তের বিনিময়ে তুমি প্রেমিক হবে?

অদিতি তুলি

বয়স বাড়লেই ঘর ছাড়ে মানুষ

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে হঠাৎ আমার কথাই তোমার মনে পড়ে আমি জানি। 
একটা চাপা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেই হয়ত ভাবো মেয়েটা কি করছে ঠিক মত খাচ্ছে কি না মাথায় তেল দিচ্ছে কি না....।
গত শীতে দুটো কাঁথা দিয়েছিলাম একটা কম্বল আগেই ছিল। 
এবার না হয় আরো একটা কম্বল পাঠিয়ে দেব।  যা চাপা স্বভাব কখনো মুখ ফুটে কিছু বলে না। 
অনিয়ম করে করে আবার কোন অসুখ না বাধায়। 
মেয়েটার আর কত হল বয়স..! 
এসব ভাবতে ভাবতে রাতের প্রহর বাড়ে,  জাগতিক নিয়মে বাড়ে চিন্তাগুলিও। 
হয়ত দু এক ফোটা জল ও গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে তোমার অজান্তেই। 
তখন হয়ত আমাদের ঘরের পেছনের হিজল গাছটা থেকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ে ফুলগুলো মাটিতে। ঝোপের ধারে কুয়ো থেকে ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আছে। নাম না জানা দু একটা পাখির ক্ষীণ শব্দ মিলিয়ে যায় উত্তরে।  
তোমার এই চাপা সংলাপের দীর্ঘশ্বাস কেউ হয়ত শোনে না দেখে না বোঝে না কিন্তু আমি অনুভব করতে পারি নয়ত আমার বুকের মধ্যে এত চাপা কষ্ট কেন হয়? 
নিজেকে বড্ড ভারী লাগে।  
চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করে তোমায় মা -
মা  মা  মা....
আমি ভালো নেই….।
অথচ মাধ্যমিকের পর আমি সেমন্তীকে কত করে উপহাস করেছিলেম -
 "তুই কি সারাজীবন বাচ্চাই থাকবি? বড় হবি কবে? মায়ের আঁচল ধরে সারাজীবন বসে থাকলে গেঁয়ো ভূত হবি ..."
বয়স বাড়লেই ঘর ছাড়ে মানুষ 
আমিও ছেড়েছিলাম
এখন বড্ড ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করছে..! 
মনে হচ্ছে দেয়াল ঘড়ির কাটা তিনটি উপহাস করে বলছে আমায় তুমি তো জড়িয়ে গেছো এক
আস্তাকুঁড়ে সভ্যতায়, শিল্পায়নের ঘূর্নিপাকে।। 
ঘড়ির কাটায় ঠিক রাত দুটো চল্লিশ 

সাগর শাহ্

এক নিমেষেই শেষ

চলছে দেখো দমের গাড়ি 
দম ফুরাইলেই শেষ, 
মিছে মায়ার দুনিয়া-দারী 
কাটছে নাতো রেষ।

তুমি আমি সেই গাড়িরচাকা, 
চলেছি দেখো আঁকাবাকা
পায়না তো চালকের দেখা। 
কি সমান্তরাল ভাগ্যরেখা.! 

জমাট বাঁধা গোলক-ধাঁধা 
গাড়ি চলছে সাদামাটা, 
নিত্য দিনই চলে গাড়ি 
চলছে চলুক বেশ।

কালো কেশটা সাদা হলেই 
গাড়ির গতি শেষ। 
তাও ভয় করে গাড়ির মনে 
সবইতো জানে মহাজনে।

কতদিন আর চলবে গাড়ি 
হয়ে কেবল দেশান্তরি, 
এভাবে তে কেমনে দিবে
হিসাবনিকাশ আপন বাড়ি। 

এভাবে তেই চলছে গাড়ি 
চলছে চলুক বেশ, 
দমের গাড়ি দম ফুরাতে 
এক নিমেষেই শেষ।

দুলাল চক্রবর্তী

শান্তি রক্ষার্থে

গিন্নি যেন নয়ন মনি
খাটে বসে রয়,
সব দেখভাল করে
বিশ্রাম পেতে হয়।

হালকা একটু ফল-মূল
বারে বারে চায়,
খাবার জিনিস নজরে পড়লে
হাতে নিয়ে খায়।

গিন্নির মনে খুশি আনতে
কর্তা করেন কাজ,
রাঁধুনী সেজে কর্তা করে
নেই যে মনে লাজ।

ভালো- মন্দ খাবার করে
রোজ খাওয়াতে হয়,
গিন্নি তুষ্ট থাকলে পরেই
জগৎ শান্তি রয়।

সংসারাতে শান্তি রাখার জন্য
সদা তৎপর স্বামী,
গিন্নির হুকুম তালিম করা
সেবার চেয়েও দামি!

অলকা গোস্বামী

নবান্ন

খুব খুব কাছে দুজন,
শীতের অলস দুপুর,
 কিংবা শিশির ভেজা মধ্যরাতে;
ইচ্ছে করলেই ছুঁয়ে যাওয়া যায় সর্বস্ব।
প্ৰেমই হারায় চোরা নদীর বাঁকে।

শুধুই দুজন,
অদৃশ্য হাজার জনের ভীড়ে,
নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পায়না অহরহ, যা
হারিয়েছে কবেই অপ্রাপ্তির
 ট্রাফিক জ্যামে।

কত যে অছিলা....,
শেষ কালে
তবু ছুঁতে চায় দুটি হাত পরস্পরে,

অঘ্রান 
ঘরে ঘরে ধানের পোয়াতি ভাঁড়ার,
হৃদয়ের কোথাও...,
খুব কাছেই
দুজনের নবান্ন উৎসব।

লিটন শব্দকর

দেখা আর না দেখায়

ভিক্টোরিয়া ল্যাম্পপোস্ট জ্বলে উঠেছে 
ভালোবাসায় ভালোবাসায়

বাদামের ঠোঙা হাতে চোখজোড়ার দিঘীতে ডুব
অবশিষ্ঠ কথা মাছেদের সাথে

মৃগেলের ঠাহরে পথবাতির আলো ধরে আমি
ছড়িয়ে দিতেই খই, তুমুল বৃষ্টি
ফুরোলে, ঠা ঠা শুকনো দুপুরের রোদে
রুপোলী আঁশের সাথে প্রথম দেখা

দৃষ্টি সরানোর অনভ্যাসে বৃষ্টি আসে
চোখ বলে বাকি রোদ রুপোলী হবে 
ঠোঙার বাদামে ক্রমশ ঘন বিকেল

জগন্নাথ বনিক

স্বপ্ন 

হলুদ খামে বন্দি থাকো,
অনেক দামি তুমি।
তোমায় খুঁজে পাওয়ার স্বপ্ন,
আজও দেখি আমি।।

আসবে কী তুমি আমার কাছে,
সত্যি হবে কী আমার স্বপ্ন।
তোমার জন্য আজও অপেক্ষায়,
দিও না তুমি আমার জীবনে দু-স্বপ্ন।।

Dec 27, 2022

ভবানী বিশ্বাস

সুখ দৃশ্য

মহিলাটা হাঁটছেন, 
মাথায় খাড়া রোদ।

ওই গ্রামের সরকার বাড়ির
পইঠায় বসলেন, 
সঙ্গে শিশুটি। 
পানের আসর শেষে
পুকুরে নামলেন। 

তারপর হাঁটছেন,হাতে কলমী। 
সাদা আঁচলটা শিশুর মাথায়, 
একটু হাপাচ্ছেন আর হাঁটছেন। 

শিশুটি তাঁর হাত ধরে হাঁটছে।
বলছে- ঠাম্মা!
আজ আমরা শাকপাতা দিয়ে ভাত খাব।

ছন্দা দাম

প্রলয় আনো

তাকাও ওহে পাহাড়,
পায়ে যে ঢেউটা আছাড় খেয়ে পড়ে...তার নীরব ক্রন্দন শোনো কি?
রাসায়নিক স্নানে দগ্ধ তার পাথুরে হৃদয় ও...
বুকে বয়ে ফেরে হেমলকের নীল জল,ভাসায় দু কূল...
সন্তান সন্ততির ক্ষিধের জঠর যাতনার তৃপ্তি দেয়।
ক্ষত বাড়ে দিনে দিনে... নিশ্চুপ নদীর অভিধানের ভাষারা হারায়,
প্রকাশের দৈন্যতা বুকের ভেতরে গুমড়ে গুমড়ে মরে!

তাকাও ওহে পাহাড়,
ভেঙে ফেলো গুরু গর্জনে ঐ গম্বোজের চুল্লিটা,...
বমি করে যে বিষাক্ত ধোঁয়ার কুণ্ডলী,
দখিনা বাতাসের পথ বদলে সৃষ্টি করো ঝড়,
গুড়িয়ে দাও সিমেন্টের অসুরগুলোর ইটগাথা দেহ!

ওহে পাহাড়...কতো আর নিঃসীম শূন্যে দৃষ্টি ছুঁড়ে তাকিয়ে থাকবে মূকবৎ!
আকাশের মেঘগুলোকে মুঠোয় ভরে নিয়ে...
ঘর্ষণ করে জন্ম দাও নতুন এক অশনীর,
ঝড় জলোচ্ছ্বাস স্রোতের তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে তাকে সৃষ্টি,
গঠিত হোক অর্বাচীন এক পৃথিবী...
ইথেন,মিথেন, হিলিয়াম...
আরো কতো বিষোদগারী দানব ডুবে যাবে এই প্লাবনে।।

পারমিতা মুস্তাফি

চড়ুই ভাতি

মিষ্টি শীতের দুপুর বেলা,
চড়ুই ভাতি হবে -
গাইছে যত নয়নতারা,
মাঠে ঘাটে এক সাথে।
রোদের ঝিলিক পরছে  গায়ে,
আহা কি আরাম -
হাসির ঢেউয়ের চমক লাগে,
নেই কোনো বিরাম।
ছোট্ট ছেলে খেলছে খেলা,
সবুজ মাঠ  টাতে -
কত রকম ফুলের বাহার,
সবুজ মাঠের প্রাতে।
এমন দিন কি ভুলতে পারি,
দারুন আনন্দ -
আবার আসুক এই দিনটাই,
চির বসন্ত।

শ্বেতা ব্যানার্জী

২২২ X বলছি

হ্যালো, হ্যালো, দ্রি,দ্রি দ্রি...।
ডোমিথি, ইরিয়স, এদের কে তৈরি রাখ।
হ্যাঁ, হ্যাঁ,  লালমুখো উই , আর হাজার হাতের মাকড়সা। 
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার মানুষ, ওদের উচ্ছেদ চাই।
ইরিয়স চারদিকে জাল বিছিয়ে ওদের ঘিরে রাখুক, 
তারপর ডোমিথিদের ছেড়ে দাও। 
ওদের বুঝতে দাও উচ্ছেদের প্রতিকার নেই। 
ওরা আমাদের মাটি কেড়েছে, কেড়েছে জল,গাছপালা, থাকার বাসস্থান। 
 বাতাসে বিষাক্ত  বিষ ঢেলে দাও, নিঃশ্বাসের সুগভীর কষ্ট দাপিয়ে বেড়াক ওদের বুকে। 
 সভ্যতার নামে যে বর্বরতা দিয়ে ওরা পৃথিবী দাপাচ্ছে, তারও বেশি নৃশংস হও তোমরা। 
 কোনো ভ্যাক্সিন সৃষ্টির আগেই ল্যাবরেটরিতে জীবাণু XXX,  --- জেট থেকে ছড়িয়ে দাও।
জৈবিক ঝড় তুলে ধ্বংস কর, অতি সভ্যতা। 
হ্যালো, হ্যালো, কন্ট্রোল রুম,  ২২২ X বলছি----
এবার প্যারাশুটে নেমে যাও উপবৃত্তাকার পথে। 
কেড়ে নাও "ম্যান্টল " যা পৃথিবীর উষ্ণ গলিত স্রোত 
পৃথিবীর হৃদস্পন্দন। ধ্বংস কর চৌম্বক শক্তি,
ম্যান্টলের ব্রিজম্যানাইট, যা পৃথিবীর বাঁচার রসদ। 
পৃথিবীকে অ- বাসযোগ্য করে তোলো।
হ্যালো, হ্যালো, দ্রি,দ্রি,দ্রি
ইনোভাস  বিএফআর রকেট তৈরি তো।

অনুভব ধর রায়

চিঠি দিও


চিঠি দিও,
তোমার না বলা কথাগুলো লিখে—
হলদে খামে কিংবা পাখির পায়ে বেঁধে,
পাঠিয়ে দিও; আমার মনের কোনো এক দিকে।

চিঠি দিও,
শত যান্ত্রিক বাঁধা উপেক্ষা করে,
স্মার্টফোনে কথা কিছুদিন বা নাই হোক!
তোমার হাতের স্পর্শে উজ্জ্বল হোক—সেই চিঠিখানা।

চিঠি দিও,
তোমার রোজ ভালোবাসার অভ্যাসে,
শত ব্যস্ততার ফাঁকে; আমি সেই চিঠি পড়ে নেবো,
যতই জোৎস্না ভর্তি হয়ে চাঁদনী রাত আসুক—
কিংবা বৃষ্টি হয়ে ভিজুক সেই চিঠিখানা!

চিঠি দিও,
তোমার মন খারাপের দিনে,
না কোনো আন্দোলনে,
আকাশের ঠিকানায় লিখে কিংবা মনের সকল অভিযোগ জানিয়ে দিও,
তবুও চিঠি  দিও!
তোমাকেই শুধু লিখে দিও।

চিঠি দিও 
ঐ যৌবনে ফিরে গিয়ে নয়,
মনের কথা লিখে দিও—
এই যুগ যেন স্নিগ্ধ হয়।

চন্দ্রা বিশ্বাস

তুমি কার

জীবন আনত মস্তকে করজোড়ে,
কাঁধের ঝোলা সামলে, কলিং বেলে হাত
বেল বাজে, বেজে যায়, বেজে ওঠে শ্ঙ্খধ্বনিও।
জীবন পূজায়, যে যার মত, দোর খোলে না।
ধূপকাঠির ফেরিওয়ালা হতাশায় ঘুরে দাঁড়াতেই,
কাকে চাই? ব্যস্ত পরিচারিকা উঁকি মারে।
না মানে , যদি ধূপকাঠি , লাগবে? 
কত্তামা পূজোয়, দরজা সজোরে বন্ধ হলো।
ডাল পোড়ার গন্ধে মাতে বাতাবরণ।
পূজা,ধূপকাঠি, ডালপোড়া, কলিংবেল, শঙ্খধ্বনি
ফেরিওয়ালা, পরিচারিকা, কত্তামা,
শব্দ-গন্ধময় জীবন পঞ্চমে।
পঞ্চ তন্মাত্রময় এই জীবনে 
হে ঈশ্বর, তুমি কার?