Dec 27, 2022

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

সখা

তবু, ইচ্ছে জাগে আবার জেগে উঠি স্ফুলিঙ্গের মত
তারপর নয় দপ করে নিভে যেতাম হালকা হাওয়াতেই।
আমার চাওয়াটা কোনো অসাধারণ কিছু নয় জানি
তবু, আমি জাগতে পারিনা, জ্বলে উঠতে পারিনা।

এই যে সমস্ত দুপুর জুড়ে ঠকঠক শব্দেরা মাথায় ঘা মারে, ভেতর থেকে বের করে আনতে চায় দু চারটে 
অর্থহীন শব্দ, তাদের প্রসব করতে গিয়েই আমি 
অচেতন হয়ে পড়ি রক্তক্ষরণে আর ক্লান্তিতে।

তবু, সাধ হয় একটিবার ফুল হয়ে ফুটুক আমার আমি
নাই বা থাকল বেশিক্ষণ গাছের বোঁটায়, ঝরে পড়ুক 
মুহূর্তে, অকালে হারিয়ে যাক ঘাসের মাঝে। 
পাঁপড়ি গুলি শুধু এধার ওধার ঘুরে বেড়াক, পখিলার মত রঙিন,  উড়ে উড়ে বসুক কোনো ডালে।

আবার জ্বলে উঠার জন্য একটি চকমকি পাথরের 
খুব দরকার, দরকার কিছু জ্বালানি।
হাত বাড়িয়ে দাও সখা, তোমার উষ্ণতার বারুদে
অন্তত একবার স্ফুলিঙ্গ হই, ফুল হই, কবিতা হই।

মিঠুন রায়

অভিলাষ (গল্প)

ভোরবেলায় হাল্কা ঠান্ডা লাগতেই সুজয় বুকের উপর ছেঁড়া কাঁথা খানিকটা টেনে নিল। গতকাল রাতে ঘুমাতে পারেনি সে। এমনি

তে সুজয় একটি প্রাইভেট জব করে। পাশাপাশি অসুস্থ বাবার চিকিৎসা রং জন্য সে ওভারটাইম করে।

সম্প্রতি সে বিয়ে বাড়িতে ফুলের সাজসজ্জার কাজ হাতে নিয়েছে। উপার্জন খুব একটা মন্দ নয়। সুজয়ের মাতৃবিয়োগ হয়েছে ছয় মাস আগে।

  মাতৃশোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সুজয়। কিন্তু কিছু করার নেই।ঘরে বৃদ্ধ বাবা বিছানায় শয্যাশায়ী প্রায় দুই বছর ধরে।

  আচমকা দরজায় কলিং বেল বাজতেই ঘুম ভাঙ্গল সুজয়ের। কাজের মাসী যে এসে গেছে। দরজা খুলতেই নজরে পড়ল একটি ছিমছিমে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কে তুমি,আমি সোমা। আপনাদের বাড়িতে তে কাজ করে, সেই সবিতা দেবের ছোট মেয়ে।

মায়ের শরীর ভীষণ খারাপ।তাই আজ আসতে পারেনি। আমিই এখন কাজ করব আপনার বাড়িতে।

   সুজয় আর কথা না বাড়িয়ে, তাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বাবার রুমে গিয়ে দেখে,সোমা  সুজয়ের বৃদ্ধ বাবাকে সুপ খাওয়াচ্ছে। প্রথম দিনের কাজকর্মে সোমা যেন সুজয়ের মন অনেকটা জয় করে নিল।ব্রাকফাস্ট করতে করতে একসময় সুজয় বলে উঠল, সোমা তুমি লেখা পড়া কতটুকু করেছ।

  আমি গতবছর বি এ পাশ করেছি।বি এ পাশ করে তুমি অনর্থের বাড়িতে কাজ করছ।না,আসলে মায়ের অসুস্থতার দরুণ এসেছি আপনার বাড়িতে। সুজয়ের চোখে জল এল।

     আসলে অন্যের কষ্টে  চোখে জল আসাটাই স্বাভাবিক। দুপুরে রান্নার বিষয় সহ বাবার ঔষধের কথা বুঝিয়ে সুজয় চলে গেল অফিসে।আজ অফিসে গিয়েও কাজে যেন মন বসে না।সোমার হতভাগ্য জীবনের কথা যেন বারবার মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন অল্প সময়ে সোমা জায়গা করে নিয়েছে সুজয়ের মনে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সুজয় দেখল , টেবিলে রাতের খাবার সাজানো। এমনকি ফ্লাস্কে গরম জল পর্যন্ত রাখা। হাত  পা ধুয়ে বাবার কাছে যেতেই অশীতিপর বৃদ্ধ বাবা বলে উঠলেন,বড় ভালো মেয়ে সোমা।নিজ হাতে আমাকে তিন বেলা পথ্য দিয়েছে।ও তে পরিবারে যাবে, সেখানেই ঘর আলোকিত করে রাখবে। সত্যিই এমন মেয়ে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সুজয়ের মনের কথাটা যেন ওর বাবা বলে ফেলেছে।

     রাতের খাবার খেয়ে সুজয় বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে  সোমার কথা।যদি সোমা চিরদিনের জন্য এই বাড়িতে থেকে যায়, তবে বেশ ভালোই হতো।কখন যে স্বপ্নের জগৎ থেকে ঘুমের অতলে চলে গেছে সুজয়,তার সে নিজেও জানেনা।

   এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। হঠাৎ হাজির সবিতা মাসী।কি গো,এখন শরীর কেমন।আছি বেশ।আজ সোমা আসে নি।

না,এখন আর ও আসবে না। 

কেন, সোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।ওর বড় মামা বিয়ের সম্বন্ধ এনেছে।পাএ পেশায়  অটো চালক। নিজের দুখানা অটো।

কথাটা শুনে যেন সুজয়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।এ কি শুনলাম। সত্যিই তো, নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। একদিনও তো সোমাকে নিজের অন্তরের সুপ্ত প্রেমের কথা জানানো হয় নি।

     নিজের এই ভুলের জন্য আজ সে অনুতপ্ত। তবে কি সোমা এ জীবনে আর তার হবে না। রাতে বিছানায় শুয়ে বারবার এই কথা ভাবছিল সে। রাতে খাওয়াও হয় নি।কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে,তার মনে নেই।

   সকালবেলায় ঘুম ভাঙ্গল অন্য খবরে। বাড়িতে বেশ জনসমাগম।আর কিছুক্ষণ বাদেই সবিতা দেবী সোমাকে নিয়ে হাজির হবেন।আজ তে সুজয়ের সাথে সোমার কোট ম্যারেজ।ছয় মাস বাদে বিয়ে। কিন্তু সুজয় তে কিছুই জানল না।তার বাবা গতকাল সবিতা দেবীর সাথে এ বিষয়ে একেবারে পাকা কথা বলেছে। সবকিছু শুনে যেন বিলম্বে হলেও সুজয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।আর জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে।তার মনের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য।

প্রদীপ কুমার মাইতি

কে বলে সূর্য অস্তাচলে

কে বলে সূর্য অস্তাচলে?
মাটির হাহাকারে দিনের শেষে সূর্য ঘরে ফিরে
সিক্ত নয়নে তুষের আগুনে জ্বলে ধিকিধিকি করে। 
তাই সে অন্তরালে। 
সূর্য কভু যায় না অস্তাচলে।
সূর্য ফিরে আসে অন্ধকার পাড়ি দিয়ে ভোরের আকাশে  প্রত্যাশার স্বপ্ন এঁকে দিতে, 
সূর্য ফিরে আসে আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে বেঁচে থাকার ঠিকানায় মুক্তির মশাল তুলে দিতে,
সূর্য  ফিরে আসে দেহের শিরা- উপশিরায় জমাট রক্তে উত্তাপ ছড়িয়ে দিতে,
সূর্য ফিরে আসে বিপ্লবী মন্ত্রে যজ্ঞের আগুন জ্বালিয়ে দিতে,
যে আগুনে পুড়ে ছাই হবে শোষণের চাকা,
নিপীড়ন, উৎপীড়ন, লোভ-লালসা যাকিছু আছে স্তব্ধ হবে একা-একা।
সেদিন নয় বেশি দূরে।
যে দিন সূর্য আর জ্বলবে না ধিকিধিকি,
ফিরবে ঘরে জয়ের ভেলায় আলোকোজ্জ্বল আঁখি। 
দিনের শেষে ফিরবে না আর নয়ন ভরা জলে, 
সূর্য কভু যায় না অস্তাচলে।

কৃপা ঘোষ

স্বপ্নপুরীর গান

বৃষ্টি তুমি একবার জানিয়ে দিয়ো তাকে
তার আমার ভালোবাসার গল্পঃ জমে আছে।

চোখের দিকে তাকায় না সে ,দেখে না আসক্তি
একা একাই আমি পরে গুমরে গুমরে মরি।

আসবেনা কী? তুমি !
প্রহর গুনি আমি
 
বাসবে না কী? ভালো !
আর কতকাল থাকবো অবহেলো

ব্যাকুলতার বেদনা গান গায় বাতাসে 
কবে জানিনা এই শব্দ তুমার কাছে পৌঁছবে।

রাত্রিরা নিঝুম আজ 
কিটেরা স্তব্ধ শুনাতে আমাকে তোর আসার শব্দ।

কৃষ্ণ ধন শীল

প্রভাতী শোভা

ভোরের কূজন যেন শ্যামলে ভজন, 
আলতো আভায় মনে লাগে শিহরণ, 
কচি কচি কিশলয়ে কচি কাচার দল
নির্ভয়ে নেচে গেয়ে করে শোরগোল। 
ফুল কলি ফুটে ওঠে আপনিতে হাসে, 
কাক-চাতক কত পাখী আকাশেতে ভাসে, 
ফুলে ফুলে ঢলে অলি লুটে নেয় রজ্ঞন, 
প্রভাত ফেরীর ভ্রমরা জুটে করে গুঞ্জরণ। 
এতক্ষণে পূবের ভানু বাড়ায় তার জাল, 
নীল-সাদায় ভরে গগন ছেড়ে দিয়ে লাল, 
ঘাসের'পরে রামধনু বিলীন হয়ে যায়, 
রঙহীন কর্মসূচী শুরু হয় তাই।

মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম

আখাউড়া সীমান্তে 

স্মৃতিমেদুর মনগহনে অবিকৃত ছিল  যাপনকালের ইতিবৃত্ত।
একদিন বিষণ্ন সময়ের কথকতা সাথে নিয়ে 
পাড়ি দিয়েছিল কাঁটাতারের ওপারে 
কোনদিনও ফিরবে না বলে 
নাকি ফেরার রাস্তা বন্ধ বলে
সেদিন কেঁদেছিল খুব।
দেখা হল না 
গাভীন গরুর সন্তান....
সবুজ ধানের খেত হলদে হওয়া....
গোলা ভরা হয়নি তখনও....
ঠাকুর দালানে মূর্তিতে কাজলের টান....
আজন্ম লালিত ভিটের নাড়িছেঁড়া বড় কঠিন!!
বাপ-ঠাকুর্দার সঞ্চিত স্মৃতি বন্ধক রেখে
নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রায় ছিল উদ্বেগ!
অনেক বছর পর দাগের এপারে দাঁড়িয়ে 
মাটির গন্ধ শুঁকে চোরা দীর্ঘশ্বাসেরা
অজান্তেই সারি দিয়ে চলে যায় দিগন্তে ।
লালপেড়ে শাড়িতে অথর্ব শরীর
ছুঁয়ে পেতে চায় হারিয়ে যাওয়া শেকড়ের সন্ধান।
দুপাশে দুদেশের সীমান্ত প্রহরীকে সাক্ষী রেখে
প্রণাম করে উঠে চোখ মুছেছিল আঁচলের খুঁটে
আখাউড়া সীমান্তের সবুজ প্রহরী
তারও চোখ ভিজেছিল বুঝি মায়ের সৌরভে ।।

প্রতীক হালদার

সংসারের কাণ্ডারী 

নৌকার ন্যায় সংসার টার
কাণ্ডারী যে বাবা,
ঝঞ্ঝা-তুফান যতই আসুক 
শিরদাঁড়া রাখে সোজা।

সংসারেতে অর্থ নিয়ে 
যুদ্ধ যখন চলে,
ঝরে পড়া ঘামের কণা 
তোমার কথা কথা বলে।

নেই অজুহাত,নেই বিশ্রাম 
নেই তো তোমার শখ,
গাছের ছায়ার মতো তুমি 
সংসারে-ই রক্ষক।

নতুন জামা,নতুন জুতো 
খেলনা কিবা খাবার,
শুধুমাত্র তোমার পরিশ্রম 
এসব করে জোগাড়।

ভাবনা তোমার অনেক বেশি
তাই তো তুমি সেরা,
সংসারটা তাই তো বাবা
তোমার শ্রমে ঘেরা।

সাগর শর্মা

এইখানে সূর্য উঠে

এইখানে সূর্য উঠে-দিনের আলো ফিরে আসে বারবার,
সোনালি রোদে ঘেমে উঠা পাতা পত্ররন্ধ্র দিয়ে হাঁপ ছাড়ে;
প্রভাত রাঙা হয় আজও ওই দূরে জুরি নদীর পারে।
কলকলে বয়ে চলে,লক্ষ্য তার দূরের গাজীপুর পাহাড়,
ধ্রুপদীর সুরে চোখের আড়ালে কে দোলায় সেতারের তার?
শীতের সবুজ পাতা শিশিরের ভারে কাত হয়ে পড়ে;
বসন্তে শুধু নয়,এখানে কোকিল বারোমাস গেয়ে চলে রাগিনীর সুরে।
সন্ধ্যায় অচেনা রেল কুহুরবে বয়ে চলে শত যাত্রীর ভার।।

এখানে শরৎ এলে এখনও শিউলি সাদা হয়ে ফোটে,
পুজোর গন্ধ পেয়ে বাঙালি হৃদয় নিয়মিত করে আনচান।
সোনালি ধান জন্ম নেয় গ্রামগঞ্জের শস্যশ্যামল মাঠে-
এ রীতি আজকের নয়,যখন একাত্তরে বাঙালি দিয়েছিল প্রাণ;
সবকিছু এক ছিল,হারানো অতীত ভেবে কেবলই বুক ফাটে!
এইভাবে হেমন্তও আসে,অপেক্ষায় থাকি কবে শুনব হেমন্তের গান।।

সজীব কুমার পাল

অলৌকিক এক সংসার (গল্প)

      তুষার এই জীবনকে ভালোবাসে না।সে চেয়ে ছিল অন্য কোনো জীবন।যে জীবনে সুখ থাকবে অথচ অহংকার থাকবে না,প্রেম থাকবে কিন্তু সেই প্রেমে অবহেলা থাকবে না।তবে কি তুষার জুই এর কাছে অবহেলিত?জুই কি এখন অন্য আকাশের নিচে বসে জ্যোস্না রাতের চাঁদের আলোর খেলা দেখে?তুষার আবার ভাবতে থাকে ,আচ্ছা পুরুষ জাতি নারীদের সৌন্দর্যে নিজেকে সঁপে দেয়,নাকি নিজের যৌবন উত্তেজনার কঠিন বাস্তবতায় নারীর প্রতি প্রবল আকর্ষণ জন্মায়? যদি নারীর সৌন্দর্যে পুরুষ মোহিত হতো তাহলে পৃথিবীর অসুন্দর নারীরা কখনো পুরুষের ভালোবাসা পেতো না।আজ রোববার ।তুষারের অফিস নেই।ঘরে বসে আছে।হাতে মোবাইলটা নিয়ে জুইকে ফোন দিল,,,,

-"হ্যালো "

-কেমন আছো জুই?

- ভালো ।তুমি কেমন আছো?

- পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ ভালো থাকা,আবার সবচেয়ে কঠিন ভালো রাখা ।আমি ভালো নেই ,তবে ভালো আছি।

- কি বলছ এইসব ?

- আচ্ছা জুই তোমার কাছে ভালোবাসা মানে কি?

- জীবন।

- কেমন জীবন ?

- যে জীবনে নদী থাকবে অথচ জলের স্রোত থাকবে না।সেই নদীতে "তুমি" নামে একটা মাঝি থাকবে, তার লগি দিয়ে "আমি" নামে একটা মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সাত সমুদ্র তেরো নদী। হঠাৎ করেই প্রবল বৃষ্টি হবে।সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে "আমি" নামে সে মানুষটা "তুমি" নামে মাঝিকে বলবে ,"আচ্ছা,অঝোর বৃষ্টিতে সাগরের মতো নদীতে কখনো ঝড় ওঠে?"তখন মাঝি বলবে," ওঠে ।সেই ঝড় অন্যরকম,সেখানে মিলন হয় জলের সাথে হাওয়ার।,,,,,,"

তুষার জুইকে থামিয়ে বলছে ,"কই সে জীবন তো আজও আমি পাইনি?"

- তুমি আমাকে আপন করতে চেয়েছ,ভালোবাসাকে নয়।কারণ আমাকে তোমার প্রয়োজন,একটা পুরুষক একটা নারীকে একটা বয়সে কাছে চায় ।তুমি সেই চাওয়ার টানে চেয়েছ আমায়।

তুষার কোনো কথা বলল না আর।কলটা কেটে দিলো।জুই অনেকবার কল করছে ,মোবাইলের শব্দ তার কানে পৌঁছাতে পারছে না ।সে এখন অন্য একটা জগতে।সে ভাবছে,সে কি তবে জুইকে শুধু রাতের সঙ্গী হিসেবে চেয়েছে! কখনো জীবনের সঙ্গী হিসেবে নয়!কিন্ত তুষার ত তাকে নিয়ে সংসার করতে চেয়েছে ঠিক তবে বিয়ের পর ।কিন্তু বিয়ের আগে যে সংসার ভালোবাসার নামে গড়া হয় সেই সংসারের সুখ উপভোগ করতে সে চায়।যে সংসার দেখা যায় না,ছুঁয়া যায় না।শুধু অনুভব করা যায় ।

সুপ্রতিম ভৌমিক

অন্ন চাই (গল্প)

            অনাথ, ক্ষুধার্ত, অন্নহারা শিশুরা ক্ষুধা নিবারণ হেতু পথে বেরিয়েছে । খাদ্যের সন্ধানে দ্বার হতে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে পথ চলছে । কোথাও অন্নের সংস্থান মেলেনি । আশাহীন অন্তরে ক্ষুধার তাড়নায় পথ পাড়ি দিচ্ছে । অবশেষে দলবদ্ধ হয়ে এসে পৌঁছেছে এক দানবীর উদার মনুষ্যের দ্বারে ।

                  প্রকৃত মানবিকতার অধিকারী সেই মানব গৃহ হতে অনাথ, অন্নহীন শিশুদের কন্ঠধ্বনি শুনতে পেলেন । দ্বারে এসে প্রত্যক্ষ করলেন, একদল অন্নহীন অসহায় শিশুকে ; শিশুরা ক্ষুধার্ত, আহার প্রার্থী, ভিক্ষা চাইছে । আর শিশুরাও ভাবছে তিনি হয়তো কিছু একটা দেবেন,জঠর জ্বালা উপসম হেতু । গৃহকর্তাকে সম্মুখে উপস্থিত দেখে তারা নিরাশ অন্তরে একটুখানি আশার পরশ পেলো , মনে আশার আলো জাগলো । গৃহকর্তা শিশুদের আশ্বস্ত করে অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন । গৃহ হতে দু'হাত  ভরে সেই দানবীর অন্ন নিয়ে খুশীতে বাইরে বেরিয়ে এলেন । শিশুদের সামনে এসে প্রাণ মন উজাড় করে অন্নদানে রত হলেন । ক্ষুধার্ত শিশুদের প্রসারিত উন্মুক্ত হস্তে অন্ন ঢেলে দিলেন । আর শিশুরাও তা' আপন মনে অনাবিল আনন্দে গ্রহণ করে ক্ষুধা নিবারণের খানিকটা পথ খুঁজে পেলো ।

স্বপন দেবনাথ

এসেছিলে একদিন

হঠাৎ এসেছিলে একদিন এই বিজন পথের বাঁকে 
চেয়েছিলাম আমরা দুজন দুজনার দিকে।
হয়েছিল অনেক কথা , যদিও ছিল না বলার কিছু
তথাপিও তোমার শব্দের ধ্বনিরা ধাবমান তোমার পিছু।
প্রস্ফুটিত এই পথের ধারে কতশত রকমারি ফুল
তোমার সেই কবরীর মাঝে খেয়েছিল তারা দোল ।
যৌবনের অরুণোদয় থেকে পরেছিল এক ক্লান্তির ছায়া 
তোমার স্পর্শে স্নিগ্ধ হলো আমার কবোষ্ণ কায়া ।
রূপে পরাক্রান্ত হয়ে তুমি করেছিলে কলরব 
তোমার রবে বিভোর হয়ে আমি হয়েছি পরাভব।

কল্যানী ভট্টাচার্য্য

সঠিক ইন্দ্রিয়

তুমি সুন্দর তুমি শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা
তোমার শক্তি নীরেট
জীবন মৃত্যুর অনুভূতি তুমি। 
যেমন হয় আলো আঁধার
আকাশ,বাতাস,জল,বায়ু
সুখ দুঃখের সম্মিলন। 
শিরায় উপশিরায় রক্তের উপস্থিতি
ঠিক তেমনি তুমিই এ ধরিত্রীর
বেঁচে থাকা। 
তুমি কোমল,তুমিই সর্বশক্তিমান
বিলিয়ে দেওয়া তোমার অধিকার। 
গড়ে তোলাই তোমার পরিচয়
শাসন তোমার অধিকার। 
সযতন স্পর্শে যুঝে নাও
জাগিয়ে তোলো জেগে থাকা
ইন্দ্রিয়ের সঠিক প্রয়োগ চাই।

পাপিয়া দাস

নির্লজ্জ

কোথা থেকে এল 
তিন তিনটে বেড়াল।
প্রতিদিনই ঘরে বাইরে
যন্ত্রণা দেয়  বেসামাল।
কর্তা যখন মারতে যায়
বলি মারবে একটু যতনে।
আমরা যদি খাবার  না দেই
খাবার  পাবে ওরা কেমনে।
ভীষণ জ্বালাতন করে সারাক্ষণ 
স্বভাব তো ওদের নির্লজ্জতা।
বাঁচিয়ে বাাঁচিয়ে রাখি তাদের
তারাই করে আমার  সাথে কপটতা।
চুরি করে খাবার খাই
আবার  বিছানায় ওঠে ঘুমাতে চায়
কতো জ্বালা সহ‍্য করব
তিন তিনটে বিড়ালের।
আমি দয়া দেখাই  তাদের প্রতি
নষ্ট করে,চুরি করে খায়
সবার খাবার।

রাজীব বসাক

ধর্না

আমি ধর্না দেবো নির্জন প্রান্তরে,
শূন্য মরুভূমির বালুচরে,
যেখানে সকাল হবে শূন‍্যতায়,
সন্ধ্যা আসিবে মরুর বালুঝড়ে।।

আমি ধর্না দেবো মৃত্যুর পরে,
যখন ধোঁয়া হয়ে বিলীন হবো,
যখন আমায় ভুলে যাবে সব, 
আমি ধর্না দেবো আমার শূন‍্যতায়।।

আমি ধর্না দেবো ভুলের মাঝে,
দূর্ভীক্ষমাখা শহরের তীরে,
যেখানে ভোরের আলো ছড়াবে,
আর্তনাদ আর মৃত্যুর কলরবে।।

আমি ধর্না দেবো মিথ‍্যার শাসনে,
রক্তচক্ষু আর অত‍্যাচারের পদযাত্রায়,
ভূমির মাটি যখন রক্তে রাঙা,
যেখানে রাত না ফুরিয়ে চলে আসে সন্ধ্যা।।

সংগীত শীল

নিস্পন্দ

তোমার তানপুরার মতো
অনেকদিন আগে থেকে
আমাদের সম্পর্কেও ঘুণ ধরেছে
শিল্পী যেমন মাধুরি মিশিয়ে 
গানগুলোকে আগলে রাখে;
আমরা পারিনি; তাই মুক্তি দিয়েছি।

হুলুস্থুলি খাঁ খাঁ দুপুর নেই বলে বোধহয় 
হ্যাপিত্যেশের কোনো সমাগম পাচ্ছি না।
হয়তো দগ্ধ চোখে ঝর্ণার জল বইছে,
অনুচ্চারিত বর্ণমালা গলা শুকিয়ে কাঠ!

এ্যালবামের স্মৃতিগুলি নিষ্প্রভ বেলায় হারিয়ে ফেলবো দুজনে,
জমানো অভিসারও একদিন কেটে যাবে।
নতুন মানুষ শ্রাবণে দীপশিখা জ্বালাবে
নতুন গানে নতুন প্রেমে বাঁধবে।

শেওলাপড়া শ্বেত পাথরে লেখা নামটি 
অবশেষে নিস্তব্ধতার ভীড়ে লুকোবে,
তোমার আমার দেখা হবে কথা হবে
শুধু কুসুমের নীড়ে পাল্টে যাবে স্বপ্নের খেলাঘর।

রমা চন্দ্র

স্পর্শ

নিদ্রাহীন রাতের আঁধার ভাঙে...
চৌকিদারের বাঁশি,
ফুটপাতে শায়িত বয়োবৃদ্ধের কাশি,
রেলগাড়ির হুইসেল...
রেলপথে চাকার ঘর্ষণ
রাতজাগা শিকারীর আঘাতে
নিরীহ পাখির অসহায় ক্রন্দন...,
গাড়ির ঘোষণা-
অনুক্ত একাকিত্বের বেদনা,
ঝিঁঝিঁ পোকা সারমেয়দের একটানা চিৎকার...
বদ্ধ উন্মাদের বিকার-
সব মিলেমিশে একাকার...!
এক ভীষণ শক্তিশালী শব্দশেল
অবিরত অবিরাম...
কান পর্দায় দেয় টোকা
উত্তেজিত অডিটরি নার্ভটি বোকা!
অস্থিরতায় ছাড়ি শয্যা
শুরু করি পদচারণা 
অজান্তে বারান্দায় যাই
মায়ের হাতের মাধবীলতার ছোঁয়া পাই,
পলকে স্পর্শিত আমি
চাঁদনী প্লাবনে ভেসে যাই-
দূর-নীহারিকায়...!

দীপান্বিতা পান্ডে দীক্ষিৎ

শুধু নিজেকে নিয়ে

সকলেই বড় ব্যস্ত নিজেকে নিয়ে, 
তাকাবার  নেই সময় অন্য কোনো দিকে ৷
ইচ্ছা সকলেই দেখুক আমাকে৷
আর আমি উঠে গেছি খুব উপরে,
নিচেটা বড্ড ছোটো মনে হয়
 দেশলাইয়ের বাক্স কি লিলিপুটেব মতো ৷
তাই সব গুলো ঠিক দেখা হয়ে উঠেনা,
কেবলই বড়গুলো থাকে ফ্রেমে বাঁধানো ৷
সাদা কাগজ না হলে অক্ষরগুলো পরিচিতি পাই না,
অর্থ না হলে অনর্থের সংস্থান হয় না ৷
মুল্যবোধ এখন লুকিয়ে থাকে কালো চাদরে ,
পাছে সম্মান হারায় লক্ষ তারার মাঝে ৷
আকাশটা শুধু ঢাকা থাক অমাবস্যার আঁধারে ৷

সায়ন্তন সরকার

সময়যাপন

ফেনা ওঠা সমুদ্রের মতো
ফনা তুলে সবাই ছুঁতে চায় আকাশ
ব্যর্থ প্রয়াস সময়ের পরিহাস ;
অঙ্গে তারুণ্যের তরঙ্গ
ঢেউ এর মতো ভেঙে যায় ,
মোহনায় মোহভঙ্গ হয় ;
তবু আসমুদ্রহিমাচল ;
ঢেউ এর পর ঢেউ এসে যায়
কেউ কেউ কেমোফ্লেজ করে ,
কেউ বা ফেকলুর মতো
কেউ কেউ করে ছুটে মরে
সাময়িক সুখ সময়ে ,
থিতিয়ে যায় নিয়মের নিয়ন্ত্রনে
কালের কলমে অমৃতের বিষে ,
মিশে যেতে হয় ;
গভীরতার সাথে সময়যাপনের
অনন্ত সুখ সবার সয় না !

রিয়া বৈদ্য

তোমাকেই

হে সাথী, তোমার প্রাণের ভিতরে
বিপ্লবের আগুন জ্বলেছিল ,
তোমার ভরাট কণ্ঠে
এখনও শুনি সম্প্রীতির সুর
তোমার হৃদয় ক্ষেতে ফুটেছিল
ভালোবাসার গন্ধরাজ ।
পথ ভ্রষ্ট পথিকের অচেনা পথে
প্রকৃত বন্ধু তুমি ।
আদর্শে ধুয়ে নিয়েছো
শরীরে নোনা ঘাম ।
জীবনের পথ পরিক্রমায়
ছড়িয়েছে সত্যের বচন ।
তোমার না বলা কথারা
ভেসে ওঠে আয়নায় ,
খেই হারানো শব্দগুলো
জড়িয়ে ধরে শুধু তোমাকেই !

অম্পিকা পাল

গর্বিত

সেদিনের উপহাস করা মানুষগুলো
তাকে এগিয়ে দিচ্ছে-
ওরা নিজেরাই জানেনা কীভাবে-
ওরা শুধু দমন করতে জানে,
দুঃখ দিতে জানে,
শোষণ করতে জানে!
কিন্তু ওরা জানেনা ওদের দেওয়া দুঃখরাই 
সন্তান রূপে জন্ম নিচ্ছে 
খাতার পাতায়।
সে একসাথে তাদের 'পদ্য' বলে ডাকে।
ওরা বিকশিত হচ্ছে, দেশ-বিদেশে হচ্ছে প্রকাশিত!
আর তাদের মা
যে একটা সময় ভয়ে ভয়ে থাকতো,
মুখের উপর কোনো উত্তর দিতে পারতো না,
সে আজ পদ্যের গরবে গরবিনী।
সেদিনের উপহাস করা মানুষগুলো 
আজ চুপ হয়ে গেছে।
আজ সে 
মুখের উপর দিতে পারছে
জমানো প্রশ্নের উত্তর!
আজ অবাঞ্চিত যা কিছু,
চাপিয়ে দেওয়া মনগড়া নিয়ম;
তার বিরুদ্ধে গিয়েও 
সফলতার হাসি হাসে ;
আজকাল কবিতারও জন্ম দেয় সে,
'যেন' শব্দটি কবিতায় যুক্ত করলেও-
তাতে রয়েছে গভীর সত্য।
আধুনিকতার পরশে 
তারা আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।

দিন দিন প্রেমিকরা কবিতার প্রেমে পড়ে
কিন্তু কে!
কে তার জীবনের পদ্য পড়বে,
প্রেমে নয় ভালোবাসায়?