Nov 29, 2022

ড.রঞ্জিত দে

পাহাড়ে একদিন 

ছোট পাহাড় ঘোরানো রাস্তা,
কয়েকঘর বসতি-দুয়ারে লাউ ঝিঙের লতা,
পাশে কলা,কাঁঠাল,আম-গাছে গাছে।
পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছোট ছরা-
ওটাই নদী-ওখানে ঘুরে বেরায় কয়েকটা হাঁস। 
পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন মোরগ। 
বনফুলের গন্ধে আন্দোলিত বাতাসে-
বন পাখি মনের সুখে ডেকে চলে,
উপজাতি রমণীদের নিত্য দিনের কাজ-
ঐ ছোট নদীর স্বচ্ছ জলে,
তামাটে হয়ে আসা বিকালের রোদে,
ঘরে ফিরে জুমিয়া বোনেরা-
জুমের ফসল ঘিরে তাদের কাজ।
শীত নেমে আসে পাহাড়ের বুকে-
দূরে কোনো জুম ক্ষেতে জ্বলে উঠে আগুন, 
আগামী দিনের ফসলের আশায়। 
পাহাড়ে একদিন ভোরের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে, 
বিকালে কুয়াশা মাখা হলুদ আলোয় দেখেছিলাম যাকে,
হারিয়ে যাওয়ার আগে খুঁজে নেবো ভেবেও,
যাওয়া হলো না,রাস্তা ভুলে যাই বারে বারে।।

কাজী নিনারা বেগম

জীবন রহস্য

ব্যর্থতার চাদর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছি।
তবুও  ধৈর্যের ইচ্ছের হাঁসিগুলো বড় রহস্যময়, 
নতুন   রঙে রঞ্জিত স্বপ্নের দেয়ালে।
ইঁট কাঠ পাথরের পুরানো বাড়িটির পা ছড়ানো আভিজাত্যের অমসৃণ দেয়ালে। 
সমাজে বিতাড়িত হয়েও লাথখোর হয়েও চলেছি   একা,
অদ্ভুত এক জীবন  রহস্যের চলচ্চিত্র সেখানে শুধু মুখোশের আড়ালে  পাঠ আদায়ের পালা। 
পালা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ!

রমা চন্দ্র

অভীপ্সা

রামধনুকে ধরব বলে
যেমন বাড়াই ইচ্ছা...
তুমি চোখের কাছাকাছি
কেবল‌ই খেলি কানামাছি!
ঝকঝকে সাঁঝের আকাশে-
শুকতারার আশে,
দূর- কাঞ্চনজঙ্ঘায়
সূর্যোদয়ের পাশে!
ছুঁয়ে যাওয়া মন
স্পর্শিত হ‌ওয়ার অপেক্ষায়...
চঞ্চল হৃদয় খোঁজে-
শুধু খুঁজে চলে যায়...
কবিতা লিখবে বলে
জীবনের শেষ অধ্যায়-
জীবনরূপী উপন্যাসের...
সাদা পাতায়!

অপর্না পোদ্দার সাহা

ডাকঘর

হাজার চিঠি লালঘরে
জমে থাকে রোজ
ডাক পিওনের হাতটি ধরে
পাই যে তোমার খোঁজ। 

অপেক্ষারা থাকে বুঝি
হৃদয়ান্ত ডোরে
ভোর হতেই চেয়ে থাকি
রাণার পাখীর 'পরে।

অফিস আদালত কর্মব্যস্ততা 
ছুটাছুটি নিত্য
অজানাকে খুঁজে বেড়াই
পাহাড় প্রমাণ সত্য। 

আয় ব্যয় হিসাব নিকাশ 
সবই তোমায় যুক্ত
পরপারে পৌঁছে গেলে 
অর্থকড়ি সব মুক্ত।

সাগর শর্মা

স্বপ্নিল পাখি

স্বপ্ন দেখতে দেখতে রাতে অনিদ্রা হয়!
সকালে টিভিতে মৃত্যুর হেডলাইন দেখে-
চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ি।

এ স্বপ্ন আমাদের নয়-
তবু স্বপ্ন দেখে সকলেই ঘুম তাড়াবার জন্য।
পথ অন্য পথে মিশে গেলে
অজানা দেশ থেকে স্বপ্ন ভাড়া করে আনি!
অবচেতনে চিন্তা করতে চাইলে,
মনোবিজ্ঞান বই খুলে দেখি
ঘুমের বদলে স্বপ্ন দেখার পদ্ধতি খুঁজি।

এই শহরে কেউ ঘুম খুঁজতে এসো না!
শুয়ে শুয়ে শরীর অবশ হলে,
গান শুনিয়ে যাবে স্বপ্নিল পাখি।

স্বপন দেবনাথ

ছত্রে ছত্রে তুমি

তোমার ওই লালচে-বাদামী চোখের আঙ্গিনায় বসে 
লিখতে চাই তোমায় নিয়ে একটি কবিতা,
যেখানে ছত্রে ছত্রে থাকবে শুধু তুমি -
আর তুমি।
তখন ভোরের সূর্য উঁকি দেবে আমার হৃদাকাশে 
আর তুমি পৃথিবীর পরে বসে থাকবে 
আমার কবিতার ছন্দালঙ্কার হয়ে ।

অসীম পাঠক

সোমরস

জীবনের স্বপ্ন আঁকি তোমার বুকে, চন্দ্রালোকিত জ্যোৎস্নার মাদকতায় তোমার মুখে শতাব্দীর ক্লান্তিরেখা গুলি  আমার কপালে এঁকে বলি  এসো --- আমার ভালোবাসার মোহানায় মিশে যাও এক নিবিড় পূর্ণতায়, জীবনের মাদকতায় অস্ত গোধূলির সন্ধ্যারাগে প্রেমের সোমরস আকন্ঠ পানে আমি নেশাতুর হতে চাই , আমি যে প্রেমের পূজারী ,কামনার ক্রীতদাস নই , মৃত্যুর শীতলতায় ডুবে যাবো যেদিন সেদিনও আমার ওষ্ঠে লেগে থাকবে শাশ্বত  ভালোবাসার সোমরস।

গীতশ্রী ভট্টাচার্য্য

 রক্তজবা (গল্প)

আজ ধ্যানে বসে কিছুতেই জপে মন বসছেনা ভৈরব চৌধুরির। এই দীর্ঘ জীবনে এরকম খুব কম ঘটেছে। মন যখনই কোনো কারণে উতলা হয়েছে তক্ষুনি এই মন্দিরে ছুটে এসেছেন। ধ্যানমগ্ন হয়ে মন কে প্রশমিত করতে পেরেছেন। আজ এমন কেন? 
অশিতিপর ভৈরব এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ। ঋজু দেহ, বলিষ্ঠ বাহু। মা তারার একনিষ্ঠ উপাসক। স্ত্রী মঞ্জরী গত হয়েছেন অনেকদিন। একমাত্র কন্যা উমা,না তার নাম তিনি মুখেও আনেন না। 
সকাল থেকেই ভক্তবৃন্দের আগমন লেগে থাকে এই কুটিরে। ভয় এবং শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভাব নিয়ে আসে সকলে। ভৈরব চৌধুরীর বজ্রকঠিন ব্যক্তিত্বের কাছে আপনা থেকেই সকলে নতমস্তক হয়ে পড়ে। মায়ের ভোগ রাগের জন্য যে সমস্ত বস্তু ভক্তরা নিয়ে আসে, তাই স্বহস্তে রান্না করে মাকে ভোগ দেন। মায়ের প্রসাদ ই তার খাদ্য। দুপুরে কেউ এলে সেই ব্যক্তিও ভোগ প্রসাদ পায়। 
আজ দুপুরেও মাকে ভোগ নিবেদন করে বাইরে প্রতীক্ষা করছিলেন ভৈরব। একটি মহিলা তখন ঢুকে আসে ভেতরে।সাদা মলিন সাদা শাড়ি, একমাথা ঘোমটা। জীর্ণ শীর্ণ দেহ। মুখ দেখা যাচ্ছেনা। অভাবী বলেই বোধ হচ্ছে। দূর থেকে দু হাত জড়ো করে সে প্রণাম জানায় মন্দিরের দিকে, ভৈরবের দিকেও। 
ইঙ্গিতে ওকে উঠোনে বসতে বলেন । অন্ন প্রসাদ গ্রহণ করে তারপর যেতে বলে মন্দিরে প্রবেশ করেন তিনি। উঠোনের একপাশে পুরনো নিমের ছায়ায় মহিলাটি বসে পড়ে। যেন সে কত ক্লান্ত। 
একখানা শালপাতায় করে মায়ের ভোগ এনে ওর কাছে রাখেন ভৈরব।
 _ কিছু লাগলে চেয়ে নিও, লজ্জা করনা। 
মাথা হেলায় মহিলা। 
অদূরে একটি সিঁড়িতে বসেন ভৈরব। অতিথির খাওয়া শেষ হলে তিনি প্রসাদ গ্রহণ করবেন। এটাই ওর নিজস্ব নিয়ম। 
একটু ঘুরে বসে মহিলাটি মাথায় ঠেকিয়ে প্রসাদ খেতে শুরু করে। অন্যমনস্ক ভাবে এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে মেয়েটির আঙুলে নজর যায় ভৈরবের। এই সবুজ পান্নার আংটি বড় পরিচিত। এত সাহস কী করে হল ওর! রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে আসে। দ্রুত ওর কাছে দাঁড়িয়ে বলেন, তুমি কে আমি বুঝতে পেরে গেছি। উঠ, এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। 
ঘোমটা খসে পড়ে ওর। দুচোখে জলের ধারা।
_ বাবা!
এই একটি শব্দ শুধু বেরিয়ে আসে। 
গেটের দিকে হাত তুলে ইঙ্গিত করেন ভৈরব। অর্ধভুক্ত খাবারের থালা ছেড়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে পড়ে উমা। ভৈরব কে এখন গোটা উঠোন জল দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। গোবর ছড়া দিতে হবে। 
সারাদিন ভৈরব আর মুখে কিছু দেননি। বাড়ি ঘর পরিষ্কার করতে করতে বেলা চলে গেছে। সন্ধ্যে হতেই এসে মন্দিরে ঢুকেছেন। কিন্তু, জপে মনোসংযোগ হচ্ছেনা কিছুতেই। তারা মায়ের মুখে উমার মুখ ফুটে উঠছে বারবার। ওর চোখের জল যেন মায়ের চোখে টলটল করছে। 
উমা একমাত্র সন্তান ওদের। আদরে, শাসনে বড় করেছেন। পড়াশোনা করতে করতেই ভালবেসে ফেলে একজনকে। যার সাথে কিছুতেই ভৈরব সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না। নিচ কুলশীল ওদের। মেয়েকে কড়া প্রহরায় রাখেন। লেখা পড়া সবকিছু বন্ধ করে দেন। কিন্তু, নিয়তির কবল থেকে কারো রক্ষা নেই। এমন কঠিন পাহারার মধ্যে থেকেও উমা পালিয়ে যায় একদিন। বিয়ে করে সেই ছেলেটিকে। 
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে অভিশাপ দেন ভৈরব , খুব শীঘ্রই পাপের শাস্তি পাবি। বিধবা হয়ে পথে পথে ঘুরবি। মঞ্জরী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এসব শুনে। এরপর খুব বেশিদিন বাঁচেন নি মঞ্জরী। তখন থেকেই একা ভৈরব। উমার কথা মনে আনাও পাপ বলে ভাবেন। নিজেকে আরো বেশি সঁপে দেন তারা মায়ের জপ ধ্যানে। 
আজ ওর হাতের পান্নার আংটি দেখে চমকে উঠেছেন । এটি তিনিই ওকে ধারণ করিয়েছিলেন । অদ্ভুত এর নকশা। দুটো সাপের মুখ সামনে। মাঝখানে পাথরটি। 
এত অভাবের মধ্যেও উমা এটি বিক্রি করেনি! আশ্চর্য! 
আজ আসনে বসে শুধু মনে হচ্ছে এই জপ, যাগ যজ্ঞ সবকিছু মিথ্যে। শুধুই আড়ম্বর। যার মনে বিন্দুমাত্র ক্ষমা, স্নেহ নেই সে কীসের মানুষ! সেতো পাথর। বুক ফেটে হাহাকার বেরিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কণ্ঠ শুষ্ক।মেয়েটি হয়ত কতদিন ভাল করে খেতে পায়নি। আর আজ তিনি ওকে খাবারের পাত থেকে উঠিয়ে বিদেয় করে দিলেন! মহাপাপ করেছেন , মহাপাপ।
তারা মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন ভৈরব। চোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। উমা আর আসবেনা , জানেন তিনি। তবু অপেক্ষা করে থাকবেন। যদি আসে , তবে ক্ষমা চাইতে হবে ওর কাছে। নইলে মুক্তি নেই, মুক্তি নেই। 
শুকিয়ে যাওয়া রক্তজবার মত লুটিয়ে পড়ে থাকেন ভৈরব চৌধুরী।

চন্দ্রা বিশ্বাস

কবি ও কাব্য

তিথি-লগ্নের শুভ ও অশুভর যথার্থ ব্যাখ্যা 
ঠিক ঠিক মিলে যায় কিনা আমার জানা নেই ।
মাহেন্দ্রক্ষণ অথবা অমৃতযোগ ঠিক কোন ক্ষণ টুকু 
তা নিয়ে গবেষণায় বসতে আমি রাজি নই ,
শুধু বুক উজাড় করে , "আমি ভালবাসি" এই দুটো শব্দ
যে মুহূর্তে বলে ফেলা গেলো ,
সেই মুহূর্তটুকুই জীবনের সেরা মুহূর্ত, মহা শুভ ক্ষণ।
প্রকৃত কবি কোন জন, তা আমার জানা নেই ,
ঠিক ঠিক কবিতা হয়ে উঠলো কোন ছন্দবদ্ধ অংশ টুকু,
সে ও এক বিতর্কিত বিষয় ।
সবটুকু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে, "আমি ভালবাসি" 
এই দুটো শব্দ,যিনি বলে ফেলতে পেরেছেন,
তিনিই প্রকৃত কবি। আর, আ---র
"আমি"ও "ভালোবাসি"এই দুটো শব্দ মিলেই
রচিত হয়ে গেলো, বিশ্বের সেরা কবিতাটি।

অলকা গোস্বামী

আমিও নারী

কবিতার সারাংশ আমিই ছিলাম,
ছিলাম ভালবাসার মোড়কে।
কেওনঝাড় এর উদ্দাম ঝরনা
আমারই চলার ছন্দে।
অরন্য সবুজ শৈশব আমার
কৃষ্ণচূড়া লাল যৌবন,
যত্নের বাগান থেকে বিদায় নিয়ে,
গেলাম পরের ঘর।

বৃষ্টি ঝরিয়ে মেঘেদের ছুটি
শরৎ আকাশ নীল,
তুলোর মত সাদা মেঘ,
ভেসে বেড়ায় চারদিক।

জীবন নদী বয়ে চলে ধীরে
সুখ পাখি বাঁধে ঘর,
দানপত্র আমি তুলে দিই হাতে
চির সবুজ হোক মিলন।

অভিযোগের গাঁঠারি ভরে, চোখ ভরা অভিমান।

চারিদিকে শুধু ধূ ধূ বালি,
আর তেপান্তরের মাঠ।

স্বপ্নভাঙা যাপন নদী, অকুলান সাথে ভাসে।
জীবনটা দামী, কোনো
আপোস আর চলেনা তার সাথে।

প্রেমে অপ্রেমে অল্পেতেই
খুশি,
বোঝেনা কেন সমাজ,
নারীসত্তা শুধুই  সম্মানটুকু চায়।

শ্বেতা ব্যানার্জী

মহাকর্ষ এক প্রেমিকার নাম

-----তারপর তুমি বললে 
তুমি যেন মৃত নক্ষত্র, 
অবাক দৃষ্টিতে আমি তোমার দিকে তাকিয়ে রইলাম, 
তুমি বললে, তোমার মহাকর্ষের বন্ধন ছেড়ে আমি কিছুতেই বেরিয়ে যেতে পারিনা। 
তোমার আকর্ষণ নয়, তোমার ভালোবাসার তরঙ্গ
আমাকে ভাসিয়ে রাখে।
ও তাই!! আমি বুঝি কৃষ্ণগহ্বর!!
হ্যাঁ সুপার ম্যাসিভ, যেখানে  আমার হৃদয়ের ম্যাসিভ আ্যটাক।
দ্যাখো, আমি তোমাকে কেন্দ্র করে কেমন ঘুরে চলেছি...।
তোমার অনন্যতায় তুমি অসীম  ---
তুমি সময়কে দাঁড় করিয়ে জবাবদিহি করো।
 তোমার দিগন্তে আমার জমা রাখা মন আজও ফিরিয়ে নিতে পারলাম না, 
কবির ভাষায় "ওই যে সুদূর নীহারিকা... "
ব্রহ্মাণ্ডের সহজ সরল গ্যাসে নিউক্লীয়ভাবে আবদ্ধ
হয়ে আজ আমাদের মন,  দুটি হিলিয়াম অণু।
তুমি বোঝনা এটা ফিউশন। 
আমাদের ভালোবাসার বিস্ফোরণ। যে বিস্ফোরণের 
আলোর রোশনাই নক্ষত্র হয়ে সংসার করে আমাদের
মনের আকাশে। 
কিন্তু ভয় হয় অনির্বাণ, 
কিসের ভয় আমি থাকতে। 
ভালোবাসার বিস্ফোরণ যদি হাঁফিয়ে ওঠে?  যদি জ্বালানি ফুরিয়ে যায়?
আমি আছি তোমার সাথে সূর্যের তেজদীপ্ত রূপ নিয়ে। 
তুমি যে বললে আমার ভালোবাসা কৃষ্ণগহ্বর। 
সে তো আমার মনের  "ইভেন্ট  হরাইজন টেলিস্কোপে" 
প্রকৃত ভালোবাসা উপলব্ধি করতে হয়,স্পর্শ নয়।
কৃষ্ণ ও কালী দুইজনেই কালো। 
প্রেম ও সংহার যেখানে মিলেমিশে একাকার। 
যেমন পদার্থবিদ্যার সূত্র ভেঙে আমরা দুই অপদার্থ প্রেমিক।

সংগীত শীল

নাহার

আঁকা বাঁকা পথের অপকটে 
আপন গভীরে আমাদের সূচপাত।
বিচিত্র বিস্ময় পুলকিত হতে থাকে
অপ্রস্তুত মুহুর্তে রোমাঞ্চিত শিহরণ জাগে দুজনার।

অমলিন স্মৃতিরা প্রহার করছে  বরাবর
তবুও কি অপরিসীম মমতা তোমার!
আমার হৃদয়াভ্যন্তরে;
অনুল্লিখিত বর্ণমালার ভিড় জমছে।

তোমার ছোঁয়াতে শীতল প্রাপ্তির অবগাহন,
দু-চোখের কাজল আমার শরীর বেয়ে নেমে আসে।
নক্ষত্রপুঞ্জ খসে যেন
ভেসে যাচ্ছি জলোচ্ছাসে।

চাঁদ মাখানো সুখের অতল সাগরে
আশা আকাঙ্ক্ষাগুলো লুটিয়ে দিয়ে,
ইচ্ছে হয় নিছক পিপাসাকাতর স্নায়ুতে,
স্পর্শ সুখের ঘ্রাণ নিতে।

প্রদীপ কুমার মাইতি

কত ঝরবে রক্তের ফোঁটা 

কত ঝরবে রক্তের ফোঁটা। 
রক্তস্রোতে ভেসে যাওয়া মাটির দিকে তাকিয়ে বোবা চোখ এক নদী জলে ডুবে থাকবে আরো কত দিন?
কতদিন থাকবে আরো স্বজন হারানো অভিশাপ,
বাতাসে ভাসবে শোকের দীর্ঘশ্বাস।
শহরে-গ্রামে,পথ-প্রান্তরে রক্তে ভেজা মাটির বুক থেকে ভেসে আসে কত শিহরিত কান্না,
জনতার স্রোত লাভ লোভের অঙ্ক কষে, নীরব প্রতিবাদে ফিরে আসে।
কেন খুন হয় স্বপ্ন গুলো? কার স্বার্থে? জানি তাঁরা মখমলের সজ্জায় শুয়ে স্বার্থের উদরে রাজ ভোগের ঢেকুর তোলে, 
ওরা পিশাচ, ওরা জল্লাদ,
ওদের অস্ত্রে উল্লাস করে ওদেরই ভাড়াটে উন্মাদ। 
ঝড় আসছে ঝড় আসবেই উড়ছে ধুলোবালি, 
লক্ষ জনতা নেমেছে পথে আগুন হয়েছে লাল,
পুড়ে ছাই হবে স্বার্থের সৌধশিখর, 
মখমলের সজ্জায় প্রহরী হবে ঘৃনার আগুন, 
রাজ ভোগের ঢেকুরে উদগিরিত হবে চাপ-চাপ রক্ত,
পুড়ে ছাই হবে পিশাচের বোনা জাল।
মাটির বুকে জন্ম নেবে নতুন সভ্যতা,
রক্ত নয় জীবন চাই জাগবে মানবতা।

পৃথ্বীরাজ দেবনাথ

বিচ্ছিন্নতা

সকালবেলা উঠে দেখি 
আমি বিচ্ছিন্ন। অথচ সূর্য উঠেছে, পাতা ঝরে পড়েছে, নদী বয়ে গেছে তার মত।
আমি নিশ্চিতভাবে বিচ্ছিন্ন। 

তাই মূল খুঁজে বেড়াই।
মূল খুঁজতে খুঁজতে রূপকথা তার নিজস্ব পথে বাঁক নেয়। বৃষ্টি নামে। দৃশ্যপট পাল্টে যায়, কালের গর্ভে জন্মায় আরেক দৃশ্যপট।

এই যে এত আলো, এত ছায়া 
আর এত উত্তাপ, এরই মধ্যে
নদী বয়ে গেছে? 
এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমেছে ধীরে,
এরই মধ্যে একটি প্রদীপ জ্বলেছে তুলসীতলায়,
এরই মধ্যে আমি জেগেছি,
আরও একবার দুঃস্বপ্নে 
বিচ্ছিন্ন হব বলে।

শর্মি দে

চন্দ্রাবলী বিষাদ

কোমল নিষাদেও সে বিরহী!

সুমেরু কুমেরুর ব্যবধান সময়ের অনুভূতির সাথে যেন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে...
এরই মাঝে দুএকটুকরো হৈমন্তিক ইশারা,
নিকুঞ্জবন আজও নেচে উঠে কথাকলি সাজে!

বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোটায় কখনো বা অজান্তে ভাগ করে বৃষ্টিসুখ,
ভিতর ঘরে জমে থাকা তার বিজন অসুখ।

একদিন সে প্রশ্রয় দেয় তার চাতক ইচ্ছেদের
ওরা যেন মায়াময় করে তোলে তার চন্দ্রাবলী রাত।
উদাসী হাওয়া যুবতী হলে...
কুজ্ঝটিকা ছুঁয়ে ঘাসফুল সাজালো নির্ঘুম রাতের আকাশ!
সোহাগী পাপড়িগুলো মেলে তার ময়ূরী পেখম
কুয়াশার অবগুণ্ঠনে ঢাকা পড়ে যায় তার সোমত্ত বিষাদ!

শতাব্দী দেবনাথ

শীত ঘুম

আধো আধো কুয়াশায় ঘুমন্ত সব ফড়িং, 
শিশির ভেজা চাঁদরের প্রলেপ ঘাসে... 
কত বার ভিজেছে মন ঘন কুয়াশায় 
হিসেব নেই তার... 
আগুনের  মিঠে তাপের ছোঁয়ায় হঠাৎ-ই চোখ লেগে যায়,
বাঁধ সাধে শুধুই অগনিত ইচ্ছে গুলো। 
শীত ঘুমে স্বপ্নের মায়া জালে 
ইচ্ছেরা সাড়া দেয় বাস্তবতার রূপে। 
আচমকাই দমকা হাওয়ায় বজ্র বিদ্যুতে 
আগুনের নীল শিখা বয়ে আনে অশ্বিনী সংকেতের বোঝা, 
কোমল শিশিরের শব্দে তিন প্রহরের  ঘুম কেটেছে আমার।
চোখ খুলেই অস্পষ্ট বাস্তবতা.. 
পরিণত পায় অবাস্তব কল্পনায়।।

রামমোহন বাগচী

জীবনের যাদুকর

ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?
অন্তর হীন আত্মীয়ের যাদুর খেলায়
ঝড়ে আত্মার অশ্রু। 
মুক বধির শিক্ষার রাজ প্রাসাদে  
দাপিয়ে বেড়ায় অন্তর হীন আত্মা
ছড়িয়ে রঙ্গিন  স্বপ্ন। 
স্বপ্নের মাঝে আছে স্বপ্ন, এ এক অপূর্ব স্বপ্ন
ধরা ছোয়ার  বাহিরে থেকেও নির্ভয়ে
চালায় আপন খেলা, দিবানিশি। 
সরস্বতীর হংস উড়ে আকাশে
ভুলে নির্মল নীরের সরোবর
শুভ্র চরিত্রে অভিনয়ের স্বর্ণপদক পরে গলে। 
যাদুঘরে যাদুর খেলা,যাদুকর বিনে
এমনি মন্ত্র শিখায়, মন্ত্র হীন আত্মা  
ছরিয়ে মায়ার জাল রাজার ভান্ডারে। 
বিশ্বের অর্ঘ দূত প্রেরণার উৎস
জ্ঞানের জোয়ার ভাটার , রত্নের ভান্ডার
রাধানগরে কৃষ্ণের অবতার। 
চক্ষু হীন আত্মা ছড়িয়ে মায়ার জাল    
প্রজাহিতৈষী মন্ত্রের নকল ঋষি করে
প্রজার সর্বনাশের  মন্ত্র পাঠ।।। 
ভাবি মনে মনে এটাই কি জীবন ?

ছন্দা দাম

ছেলেটা পণ করেছিল

ছেলেটা পণ করেছিল কাঠের লাঙ্গল হবে...
পৃথিবীর বুক চিড়ে সবুজ আঁচলে সাজাবে এক ফোঁটা দুগ্ধ সুধা,
ছেলেটা পণ করেছিল হলুদ ধানের গোলা হবে...
আঁধারের ওপারে যারা হারিয়ে গেছে ফোটাবে তাদের চোখে আলোর ক্ষুধা।

ছেলেটার পণ ছিল শক্ত হাতের পাঁচ আঙুলে... 
ভেঙে ফেলবে সব অর্থহীন ব্যরিকেট ,
হয়তো মাটি ছোঁয়া হাতে থাকবে না প্রযুক্তির আঁকিবুঁকি...
কিন্তু শান্তির ছায়াময় নিঃশ্বাসে ভরে থাকবে তার প্রিয় বুকপকেট।

ছেলেটা মশালের আলোয় অ আ ক খ র স্বরলিপি লেখবে আশ্বাস দিয়েছিল...
প্রজন্মগুলো ঘুমহীন রাত তারই অপেক্ষায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে...
হাত বাড়িয়ে মাইলস্টোন  ছুঁয়ে দেবে এই স্বপ্নে 
আকাশটা দিগন্তের অন্ধকার ঈশানে যায়নি হারিয়ে।।

কতো স্বপ্ন,কতো বাস্তব কতো ইচ্ছে ,কতো পূর্ণতা...
ছেলেটার ছোট্ট নোটবুকের কালো অক্ষরে ঘুমিয়ে আছে...
ছেলেটা আজো জোনাকির কাছে আলো চায় ধার..
একটা শান্তির ঘুম ছেলেটা খুঁজে ফেরে...
এখনো সন্ধ্যের শোকতারা জ্বলা রাতের কাছে।

অনির্বাণ মিশ্র

প্রেয়সী

রূপের আগুন জ্বালি কে তুমি গো বনমালী
এ জনমে হলে ওগো রাধা।
এমনি সে প্রেমডোর বাঁধিয়াছ হৃদে মোর
 পড়েছি তোমারি প্রেমে বাঁধা।।
মোহন মুরতি খানি সমুখে চিকুর টানি
অপার লাবণী শোভা পায়।
কাজলে রাঙানো আঁখি অপরূপ শোভা দেখি
রবি শশী লাজে মরি যায়।।
ললাটের ওই বিন্দু, হৃদয়ের প্রেমসিন্ধু
চাহনি তব তীরসম ধায়।
প্রেয়সী গো প্রেমময়ী গীতি বর্ণ ছন্দময়ী
কবির প্রেরণা তুমি তাই।।