বিল্টুর গল্প
বিল্টু এ পাড়ার এক পরিচিত নাম। দামাল ছেলে হিসেবে ওর যথেষ্ট নামডাক আছে। কিন্তু ওর দামালপনার আড়ালে যে একটি সংবেদনশীল মন আছে একথা কিন্তু অনেকেই জানে না। আজ এখানে সেসব গল্পই বলব।
ওই যে দূরে, এ পাড়ার একেবারে শেষ প্রান্তে বহু পুরোনো হলুদ রঙের ছাদ পেটানো একতলা একটি বাড়ি, সেটাই বিল্টুদের বাড়ি। তিন পুরুষ আগে ওর ঠাকুরদা এই বাড়িটি বানিয়েছিলেন। ওদের বাড়ির পেছনদিকে একটি বাগান ও তৎসংলগ্ন একটি ঘাট বাঁধানো পুকুরও আছে। এখন ওখানে আম কাঁঠাল সহ নানা বড় বড় গাছ গাছালি ও গুল্মলতা ওদের বাড়িটিকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। ওই ছায়া ঘেরা এলাকায় বিল্টু সারাদিন রাজত্ব করে বেড়ায়। শালিক চড়ুই দোয়েল সহ আরো কত নাম না জানা পাখি ওদের বাগানে এসে বাসা বেঁধে আছে! বেড়ে ওঠার সাথে সাথে ওই পাখিগুলো, পুকুরের মাছ, বাড়ির পোষা বেড়াল সকলের সঙ্গে ওর প্রগাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে ওদের দানা খাওয়ানো, ওদের সঙ্গে সময় কাটানো ওর নিত্যদিনের কাজ।
বিল্টু পড়াশোনায় যেমন তুখোড় তেমনি উদার মনের। ভালো ছাত্র হওয়ার সুবাদে স্যারেরাও ওকে খুব স্নেহ করেন। প্রাথমিক স্কুল পেরিয়ে সে এবার মাত্র হাইস্কুলে পদার্পণ করেছে। তবু ক্লাশে ওর বিচক্ষণ বুদ্ধি ও দরদী মনের জন্য ওর বন্ধু মহল ওকে ক্লাশ ক্যাপটেন বানিয়ে দিয়েছে। বন্ধুদের কাছে বিল্টু মানেই মুশকিল আসান।
একদিন বিল্টু স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখল ওদের গেটের পাশের ড্রেনে একটি বেড়াল ছানা পড়ে ওই নোংরা জলে খাবি খাচ্ছে। ও একছুটে ঘরে ঢুকে পিঠের ব্যাগটি বিছানায় ছুঁড়ে ফেলেই বাইরে বেরিয়ে গেল। পেছনথেকে মা চেঁচিয়ে ডেকে দুরন্ত ছেলের পিছু নিয়ে দেখলেন, ড্রেনের জলে খাবি খাওয়া একটি বেড়াল ছানাকে বাঁচানোর জন্যই ওর এত তৎপরতা। ও কত বুদ্ধিই না এঁটে যাচ্ছে তখন। অবশেষে একটু কসরত করে একটি বড় কাঠের টুকরো নিয়ে একপাশ ধরে অপর পাশ ড্রেনের জলে ডুবিয়ে দিতেই কুঁকড়ে যাওয়া বেড়াল ছানাটি কাঠ বেয়ে ওপরে উঠে এলো। এতে বিল্টুর আনন্দ আর ধরে না। মায়ের গজগজ এড়িয়ে সেদিন ও ওর ফ্রেন্ড ফিলোসফার ও গাইড দাদুভাইর সঙ্গে জোট বেঁধে বেড়াল ছানাটিকে পরিস্কার জলে স্নান করিয়ে একটু দুধ খেতে দিল। এরপর থেকে ওই ছানাটি ওদের বাড়িতেই থেকে গেছে। বিল্টু ওর নাম রেখেছে কুটুস। কুটুস এখন বিল্টুর খুব ন্যাওটা হয়ে গেছে। যতক্ষন বিল্টু বাড়িতে থাকে ততক্ষণ ওর পায়ে পায়েই ঘুরে বেড়ায় আর ম্যাঁও ম্যাঁও করে ল্যাজ নাড়ায়।
বিল্টুর মায়ের হয়েছে যত জ্বালা। ওর এসব দুরন্তপনা লাগাতার চলতে থাকে আর মায়ের ধরে যেন প্রাণ থাকে না। কিন্তু যার প্রশ্রয়ে বিল্টু এমন খেয়াল খুশি ঘুরে বেড়ায়, তিনি হলেন ওর প্রাণপ্রিয় ঠাকুরদা। তাই মা বিশেষ কিছু বলতেও পারেন না। সেদিন বিল্টু স্কুল থেকে ফেরার পর প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি শুরু হলো সঙ্গে আলোর ঝলকানি ও বজ্রপাত। এক একটি বজ্রপাতের শব্দে যেন কানে তালা লেগে যাচ্ছে। সঙ্গে ঝড়ের দাপট। এদিকে মায়ের চোখ বাঁচিয়ে বিল্টু কখন ছুটে চলে গেছে বাগানে! আম গাছের মগ ডালে থাকা পাখির বাসাটি ভেঙে কোন পক্ষীশাবক নিচে পড়ে গেছে কিনা সেসব পরখ করতে । এরপর ওর দাদুভাই ই সেদিন আতঙ্কিত হয়ে ছুটে গেছিলেন এই ঝড় জল থেকে নাতিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঘরে ফিরিয়ে আনতে। এমনি করেই দিনভর বিচ্ছু ছেলেটি সকলকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।
এইতো গতবার পুজোর সময় বিল্টু কী কান্ডটাই না ঘটিয়েছিল। ব্যাপার খানা হলো এই, বিল্টুর অস্টমীতে পড়ার নতুন জামাটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মা যখন হন্যে হয়ে খুঁজে বিল্টুকেই জিজ্ঞেস করলেন,ওর দাদুর বাড়ি থেকে পাঠানো আকাশ নীল জামাটি কোথায় আছে, তখন বিল্টু বললো "মা ওটা আমি আমার স্কুলের বন্ধু সন্তুকে দিয়ে দিয়েছি"।
—সে কী রে!! কেনো?
—জানো ওর না একটিও নতুন জামা হয়নি এবার। ওরা ভীষণ গরীব মা। ওর বাবা একটি মুদি দোকানে কাজ করেন। এবার ওনার খুব অসুখ হয়েছিল তো তাই ওনার সব টাকা ঔষধ কিনতেই খরচ হয়ে গেছে"। ক্ষুব্ধ বিস্মিত মা একটু রাগত স্বরে বললেন " তাই বলে তুই আমায় একবার জিজ্ঞেস করবিনা ? ওটা তো তোর দাদুর দেওয়া সব থেকে সুন্দর জামা ছিল"।
—তাতে কী হয়েছে মা!! আমার তো অনেকগুলো জামা হয়েছে। ওর বুঝি একটাও হতে নেই! অগত্যা মা আর কী করেন। তিনি চুপ হয়ে গেলেন।
এমনি বিল্টুকে নিয়ে যে কত গল্পগাথা আছে ,সেসব লিখতে বসলে একেবারে মহাভারত হয়ে যাবে। যাক আজ আমি বিল্টুর গতকালের ঘটনাটি লিখেই আমার গল্পের ইতি টানছি।
এইতো গতকাল ওরা সবাই পুজোর বাজার করতে গেছিল। বিল্টুর এসব দোকানে দোকানে ঘোরাঘুরি একদম পোষায় না। ওকে হাতছানি দেয় খোলা আকাশ। কিন্তু মা তো নাছোড়, ছেলেকে নিয়েই যাবেন। হঠাৎ বিল্টুর মনে পড়ল, বাজার শেষে নিশ্চয় রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়া হবে, এই লোভেই সে যেতে রাজি হয়ে গেল। এরপর সারাদিনের বাজার হাট শেষে ক্ষুধার্ত ক্লান্ত সকলে বিল্টুর তাগিদে বাজারের পাশেই একটি পর্দা ঘেরা হিমশীতল রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করলেন। বিল্টু গোল গোল চোখে দেখছে, ওখানে সবাই ওর জিভে জল আনা চিকেন চাউমিন খাচ্ছে। বিল্টুও চিকেন চাউমিন খেতে চাইল এবং ওদের টেবিলে খাবার পৌঁছতেই ও গোগ্রাসে খেতে আরম্ভ করল। খেতে খেতেই হঠাৎ কী যে হলো, প্লেটটি সরিয়ে রেখে বিল্টু কাঁচের সুইংডোর ঠেলে বাইরে বেরিয়ে গেল। অনুকম্পা নিয়ে মা পেছন থেকে বলে উঠলেন, 'কি হলো বিল্টু, কোথায় যাস'? ততক্ষণে বিল্টু বাইরে বেরিয়ে গেছে। ফিরে এলো একটি মলীন জীর্ণ জামাকাপড়ের ধূলো বালি মাখা নোংরা ছেলের হাত ধরে। ছেলেটিকে ওর পাশে বসিয়েই বলল, 'ওর জন্যও একটা ডিশ অর্ডার করো তো মা! আমি যে খাচ্ছিলাম ও বাইরে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখছিল। ওর বোধকরি ক্ষিদে পেয়েছে আর চাউমিন খেতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। ছেঁড়া জামা দেখেই বুঝেছি ওরা খুব গরীব। এতো পয়সা নেই ওদের,তাই আমাদেরই তো ওদের খাওয়াতে হবে, তাইনা মা? ছেলের কথা শুনে মায়ের চোখ জলে ভরে উঠল। তিনি সারাদিন ছেলেকে কত বকাঝকা করেন! স্কুলের টিফিন বন্ধুদের বিলিয়ে দেয় বলে কত অভিমান করেন! আর ছেলে কেমন মায়ের অজান্তেই মানবিক গুনগুলো নিয়ে বড় হয়ে উঠছে! তিনি মনে মনে দুইহাত জোড় করে ঈশ্বরকে প্রণাম করে বললেন, ' ঠাকুর তুমি ওর এই মনটি বাঁচিয়ে রেখো। বড় হয়েও জেনো এমনি করেই ওর মনে সকলের প্রতি দয়া মায়া, শ্রদ্ধা সম্মান,প্রেম ভালোবাসা অটুট থাকে। তবেই আমার বিল্টু আদর্শ মানুষ হয়ে উঠবে। তুমিই দেখো ঠাকুর"। বলেই তিনি আরো এক প্লেটের অর্ডার করতে কেশ কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলেন...।।