আমরাও দায়বদ্ধ
ঝকঝকে নীল আকাশ। কুয়াশা কেটে একটু একটু করে রোদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ভালোলাগা আবেশ মন ছুঁয়ে যায়।
দুবছর হয়েছে এই শহরে ট্রান্সফার হয়ে এসেছে সমীর রুচিরা, আর ওদের সাত বছরের ছোট্ট ছেলে বুবাই।
বুবাই এবারে ক্লাস টু তে। শুরুর দিকে ক্লাসের অন্য বাচ্ছাদের সঙ্গে মিশতে অসুবিধা হলেও এখন অনেকেই বুবাইর বন্ধু। পাশাপাশি কোয়ার্টার তাই বিকেল হলেই পার্কে খেলতে যাওয়া, ঘুড়ি ওড়ানো এসব চলতে থাকে। শুরুতে যে মন খারাপটা ছিল , এখন সেটা অনেকটাই কমেছে। মাঝে মাঝে পুরনো বন্ধুদের কথা বুবাইয়ের মনে পড়ে বৈকি!!
রুচিরা বুবাইয়ের পড়াশোনা নিয়ে ভীষন সচেতন।প্রত্যেক ইউনিট টেস্ট এ A+ আনতে হবে, নাহলেই ঘরে অশান্তি।
সমীর বুঝিয়ে উঠতে পারে না। এত অশান্তি করে লাভ নেই। বুবাই কে বড় হতে দাও। এমনি বুঝবে পড়াশোনার গুরুত্ব। শুধু পড়াশোনা করে কী হয় বলত! জীবনে একজন ভালো মানুষ হতে গেলে সবকিছুর দরকার আছে। সবচেয়ে বেশি যা জরুরি সেটা হচ্ছে ওকে শৈশব উপভোগ করতে দাও,কেড়ে নিও না। এই দিনগুলো আর ঘুরে আসে না।
সমীরের শুধু রবিবার ছুটি। তাই ওই দিনটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে বুবাই। নানান বায়না থাকে সেদিন। বাজারে নিয়ে যাও, জু দেখাতে ,নয়ত কোথাও বেড়াতে... এসব কত কী! গাছে কোন পাখি দেখলে সেটা কি পাখি, ওর বাড়ি কোথায় , মা সাথে আছে কিনা, কত্ত কি প্রশ্ন। সমীর বুবাইর প্রশ্নের জবাবে কখনো অধর্য হয় না। ধীরে সুস্থে হাসি মজাক করে সব উত্তর দেয়।
অনেকদিন থেকে মামাতো দিদি আরতি ফন করে বলছে ওদের বাড়ি যেতে। অনেকটাই দূর তাই সমীর তেমন যাবার ইচ্ছে দেখায় নি। আজ রবিবার, অনেকদিন বেড়াতে যাওয়া হয় না। তাই সমীর রুচিরা আর বুবাইকে নিয়ে দিদির বাড়িতে বেড়াতে গেলো।
অনেক দিন পর সমীর কে দেখে খুব খুশি হলেন আরতি দেবী। বাড়ির অবস্থা স্বচ্ছল ছিলনা তাই ছোটবেলা মামার বাড়ীতেই কেটেছে আরতি দেবীর। তাই ছোটভাই সমীর কে খুব স্নেহ ও করেন। এখন এই বড় শহরের অভিজাত এলাকায় নিজের বাড়ী।ছেলে মেয়ে দুটোই বিদেশে থাকে। সুন্দর দোতলা বাড়ি... ছিমছাম সুন্দর করে সাজানো সবকিছু। কোনো আতিশয্য নেই। রুচিরা বুবাই কে বলল,
যাও পিশিমনি কে প্রনাম কর। আরতি দেবী জড়িয়ে ধরলেন বুবাইকে।
কী যে বল,রুচিরা! আমার ভাইপোকে আজ এতদিন পর দেখছি, কী যে ভাল লাগছে। তোমরা এতদিন হয়ে গেল এই শহরে আছ অথচ আমার বাড়িতে আজ...
কী বলব রাঙা দি, আর বলনা, অফিসে এত কাজের চাপ। তাছাড়া নূতন এসেছি চেনা জানাও হয়নি তেমন।
কথার মাঝখানে হটাৎ করে ধাম করে দরজা ধাক্কার শব্দ শোনা গেল।
এই রে, শুভ নিশ্চয়ই। সুচরিতা এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। সমীর দেখলো
লাফাতে লাফাতে একটা ছেলে ঘরে ঢুকল। বয়সে হয়ত বুবাইর চেয়ে একটু বড়ই হবে।
ধপ করে সোফায় বসে পড়লো। অনবরত আঙ্গুল নাড়ছে আর মুখ দিয়ে মৌমাছিদের মত ঘু...ঘূ... শব্দ বেরুচ্ছে। পরিবেশ টা হটাৎ করে কেমন পাল্টে গেল। ছেলেটার পিছন পিছন ওর মা ও এসে ঢুকলেন। আরতি দেবী পরিচয় করিয়ে দিলেন।
এই আমার ভাই সমীর আর বউ রুচিরা, ছেলে বুবাই।
এখানেই থাকে।
আর সমীর ইনি হচ্ছেন মিসেস দত্ত আমদের প্রতিবেশী। এই যে শুভ দেখছো ও আমার বন্ধু। আমার সংগে চোখ দিয়ে কথা বলে.... বাগানে আমার ফুল গাছে জল দেয়। অনেক হেল্প করে....!
শুভ উঠে গিয়ে বাবাইর পাশে গিয়ে বসল। বাবাইর মুখের কাছে মুখ নিয়ে খুব ভালো করে দেখল। সমীর বলল,
দেখ ওর সমবয়সী তো তাই পাশে বসে দেখছে।
হঠাৎ উঠে পড়ল শুভ। ঠিক যেভাবে এসেছিল সেভাবেই তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। মিসেস দত্ত ও ওর পিছন পিছন বেরিয়ে গেলেন।
আরতি দেবী বললেন,
সত্যি কী যে খারাপ লাগে মিসেস দত্ত কে দেখলে। কোনো কিছুর অভাব নেই ওদের। হাসব্যান্ড এম এন সি তে বড় চাকরি, নিজেও নামী কলেজের প্রফেসর ছিল। এই ছেলের জন্মের পর ডাক্তার যখন বলল যে বাচ্চা অটিস্টিক ও এমনি নিজের ভাবেই থাকবে। ওদের ব্রেইন এর কোনো একটা পার্ট নাকি ডেভেলপ হয় না। এর স্থায়ী কোনো চিকিৎসা ও নেই। মিস্টার ও মিসেস দত্ত কত জায়গা তে গেছে শুভ কে নিয়ে ট্রিটমেন্ট এর জন্যে। কিন্তু খুব একটা ভাল ফল পাওয়া যায় নি।সেই তখন থেকে মিসেস দত্ত চাকরি ছেড়ে বাচ্চার সংগে ছায়ার মত আছে । ওর জীবন ছেলেকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে। শুভ কথা বুঝতে পারে। কিন্তু বলে না, ওই তো চোখের ইশারা বা হাত দিয়ে বুঝিয়ে দেয় নিজের কখন কি দরকার।এরকমই নাকি হয় অটিস্টিক.... তাইতো ওরা ভগবানের বিশেষ শিশু।
রুচিরার চোখ জল ভরে এলো। শক্ত করে চেপে ধরলো বাবাইয়ের হাত।
বাড়ী ফেরার পথে সমীর বলল, জানো তো আমি ভগবানকে সবসময় ধন্যবাদ জানাই যে এমনি করেই সব ঠিকঠাক রেখো। বেশী টাকা পয়সা,সম্পত্তি এসব কোন কাজের যদি বাচ্চা এমন হয়।
রুচিরা চুপ করে সমীরের কথা শুনছিল,বলল
শুভ র চোখ দুটো কী মায়াভরা আর নিষ্পাপ। ওরাই তো ভগবান গো। আমার ছেলে ঈশ্বরের কৃপায় সুস্থ সবল আছে। ওকে নিয়ে কত স্বপ্ন কত উচ্চাশা। শুভর মায়ের কথা ভাবলেই আমার বুকটা মোচড়ে উঠছে।
সমীর বলল,
রুচিরা এবার থেকে ছুটির দিন গুলোতে আমরা স্পেশাল চাইল্ড দের স্কুলে যাব, ওদের সাথে সময় কাটাব। সামাজিক দায়বদ্ধতা আমাদেরও তো আছে।